স্বপ্নের নাম ডুমলং (পর্ব ২)

Tahin

Hi, I am Tahin, IT professional from Dhaka. Love to watch movies, cycling and traveling is my passion :)
টিউন করেছেন Tahin | May 13, 2014 11:56 | পোস্টটি 1,728 বার দেখা হয়েছে

স্বপ্নের নাম ডুমলং (পর্ব ২)


আগের পর্বের লিঙ্কঃ স্বপ্নের নাম ডুমলং (পর্ব ১)

বান্দরবান নামার পর ছুটে গেলাম রুমা বাসস্ট্যান্ড, যদি লাস্ট বাসটা পাওয়া যায় তাহলে আর একটা দিন নষ্ট হবেনা। ভাগ্যের জোরে পেয়েও গেলাম এবং উঠে বসলাম ছাদে। আবু বকর কোত্থেকে যেন নিয়ে এলো নিয়ে এলো দুটো জাম্বুরা আর আমরা চলন্ত বাসের ছাদে গাছের ডালপালা থেকে মাথা বাঁচিয়ে শুরু করলাম জাম্বুরা ছিলা, তখন মনে হল আহা লাইফ ইজ গুড। নদীর ঘাটে পৌছাতে পৌছাতে একদম রাত।

DSC_8609

পাহাড় সম্পর্কে যাদের ধারনা নেই তাদের জন্য বলি, এখানে সন্ধ্যা বলতে কোনো বেলা নেই, বিকেলের পর ঝুপ করে অন্ধকার নেমে যায়। তবে এই বিকেল আর রাতের মাঝামাঝি অল্প কিছু মুহূর্ত যে কিরকম অপার্থিব সেটা বোঝানোর সাধ্য কোন সাহিত্যিক অথবা ফটোগ্রাফারের নেই। যাই হোক, অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে নৌকার ছইয়ের উপর উঠে বসলাম। রুমা বাজার নেমে বন্ধু আবু বকরের রেফারেন্সে একটা হোটেলের এমপি স্যুইট(!) পাওয়া গেলো। কোনরকম ফ্রেশ হয়ে ছুটলাম আরেক আবু বকর ভাইয়ের হোটেলে ডিনার করতে। (আবু বকর, আবু বকর এভরিহয়ার এন্ড অল অফ দেম আর টু গুড)। সারাদিন না খাওয়া, পেরেশানি, উত্তেজনা, জার্নি আর এত্ত ধকলের পর পাহাড়ি লাল চালের ভাত আর প্রচণ্ড ঝাল দিয়ে রান্না করা পুকুরের মাছের অমৃতের উপর আমরা যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লাম সেটা দূর থেকে দেখলে যে কেউ লজ্জা পেতে পারতো। খাওয়া-দাওয়ার পর সবাই মিলে বের হলাম সকালে কোন রাস্তা দিয়ে রুমা ত্যাগ করব সেটা রেকি করতে। ঠিক হলো খুব ভোরে আর্মির চোখ ফাঁকি দিয়ে বের হয়ে যেতে হবে যেহেতু আমাদের সাথে কোন গাইড নেই। প্রাংজাং পাড়া পর্যন্ত আমাদের গাইড বন্ধু আবু বকর। সত্যিকারের এডভেঞ্চার শুরু হওয়ার উত্তেজনায় প্রচন্ড ঠাণ্ডার মধ্যেও আমাদের গরম লাগতে লাগলো।

DSC_8615

ফযরের আযান পড়ার আগেই অন্ধকারে বের হয়ে পড়লাম আমরা চার অভিযাত্রী। প্রাথমিক গন্তব্য মংপ্রুপাড়া। সারারাতের কুয়াশায় ভেজা পাহাড়ি পথ, যে কেউ দেখলে ভাববে কিছুক্ষণ আগেই মুষলধারে বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে। এই পথ ধরে খাড়া উপরের দিকে উঠে চলা, পা পিছলে যেতে যেতে বাঁচলাম বেশ কয়েকবার। এভাবেই একটা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে আবার নিচে নামা। ভেজা পাহাড়ি রাস্তায় উপরে উঠা থেকে নামা অনেক বেশি কঠিন, শরীরের ভারের সাথে যুক্ত হওয়া ব্যাগের ওজন সবকিছু মিলে ঢালু পিছলা পথে ব্যালান্স করা অসম্ভব ব্যাপার। একবার পা হড়কালে কত নিচে পড়বো তার ঠিক নেই, সাথে ফ্রী হিসেবে হাত পা মাথা যে কোন কিছুই ভাংতে পারে। একটা সময় মনে হচ্ছিলো আর বুঝি সম্ভব নয়। কোনরকম একটা গাছের গোড়ায় বসে পড়লাম সবাই মিলে আর তখনি দেখলাম হাতে বন্দুক নিয়ে পাহাড়ি ছাগলের মতো লাফাতে লাফাতে এক লোক এগিয়ে আসছেন আমাদের দিকে। কাছে আসার পর জানলাম উনি খরগোশ শিকার করতে বের হয়েছেন। এবং কিছুক্ষণ কথা বলে আমাদের সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটা দিলেন, আমরা নাকি সম্পূর্ণ ভুল রাস্তায় এসেছি, এই রাস্তা দিয়ে মংপ্রু পাড়ায় যাওয়া যাবেনা। এখন এই পিছলা পথ বেয়ে উপরে উঠে, আবার নিচে নেমে রুমা পৌঁছে আমাদের সঠিক রাস্তা ধরতে হবে।

 

পাভেল এর মধ্যে কয়েকবার আছাড় খেয়ে জামা, প্যান্টের বারটা বাজিয়ে ফেলেছে, আমাদের অবস্থাও খারাপ, সবার জুতার নিচে কাদা লেগে গ্রিপ বলতে কিছু নেই। সেই অবস্থায় কোনরকম গাছের শিকড়, বাকল ধরে হাচড়ে-পাচড়ে উঠে আবার রুমা এসে কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করে সঠিক পথ ধরলাম। এই পথটা আগেরটা থেকে অনেকখানিই ভালো। অবশ্য ততক্ষণে সূর্যিমামা উঁকি দিয়েছে তাই মাটির স্যাঁতস্যাঁতে ভাবটা আর নেই। খাড়া উপরের দিকে উঠছি আর অনুভব করছি আমাদের চারপাশে কুয়াশার হাল্কা আস্তরন। আবহাওয়া এতোটাই ঠান্ডা আর তার মধ্যে আমরা ঘেমে একাকার, কিছুক্ষণের জন্য থামলেই সবার শরীর এবং মাথা দিয়ে আক্ষরিক অর্থেই ধোঁয়া বের হচ্ছে হিট এডজাস্টমেন্টের জন্য। আমরা সবাই একটু পরপর থামছি, হাপাচ্ছি, পানি খাচ্ছি এবং প্রকৃতির মেলে দেয়া সৌন্দর্য গোগ্রাসে গিলছি।

DSC_8638DSC_8638

শুধু সবুজ রঙেরই যে কতরকম শেড হতে পারে সেটা কাওকে বলে বা ছবি দেখিয়ে বুঝানো সম্ভব নয়। এটা চোখ দিয়ে দেখতে হয়, অনুভব করতে হয় এবং মনের ভিতর গেঁথে নিতে হয়। যে পাহাড়টায় উঠছিলাম সেটার চূড়ায় পৌঁছে নিচে তাকিয়ে কিছুক্ষণের জন্য আমি বাকরুদ্ধ। এতক্ষণ যেটাকে আমরা কুয়াশা ভেবেছিলাম সেটা আসলে মেঘ এবং সেই বিস্তৃত মেঘমালা এখন আমার পায়ের নিচে। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক দৃশ্যটা তখনি দেখলাম। আমার চোখের সামনে দিয়ে প্রথমে রাহুল, তারপর আবু বকর এবং সবশেষে পাভেল আস্তে আস্তে মেঘ ফুঁড়ে বের হয়ে আসলো। (চলবে)

সবগুলো ছবির কৃতিত্ব Sirajus Salekin (Pavel)

  • Ifat Sharmin

    ভীষণ ভালো লাগলো, ধন্যবাদ, শুভ কামনা রইলো আপনার জন্যে।

  • jony

    আমার জানা মতে দুমেলং যেতে মংপ্রু পারা যাওয়া লাগে না |