কোরবানি বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নোত্তর (পর্ব-০২)

টিউন করেছেন Miraj Rahman | September 30, 2014 03:11 | পোস্টটি 1,313 বার দেখা হয়েছে

কোরবানি বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নোত্তর  (পর্ব-০২)


korbani5

১. প্রশ্ন: শুনেছি যে, আকীকায় মাদা বকরি যবাই করতে হয়। কেউ যদি মাদা বকরির পরিবর্তে নর ছাগল যবাই করে তাহলে কি কোনো সমস্যা হবে?

উত্তর: মাদা বকরি বা নর ছাগল যে কোনোটি দ্বারা আকীকা করা যায়। মাদা বকরি দিয়েই আকীকা করতে হয়-এ কথা ভিত্তিহীন।

[জামে তিরমিযী ১/১৮২-১৮৩; সুনানে নাসায়ী ২/১৬৭; মুয়াত্তা ইমাম মালেক ১৮৬; মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ১২/৩২২]

৩২. প্রশ্ন: আমি একজন চাকরিজীবি। গত কোরবানির সময় আমার বেতনের ৩০ হাজার টাকা আমার প্রতিষ্ঠানের নিকট বকেয়া ছিল। কোরবানির সময় আমার নিকট কোরবানি দেওয়ার মতো কোনো নগদ অর্থ বা অন্য কোনো সম্পদ ছিল না। তখন আমি একজন আলেমের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলাম। তিনি আমাকে বললেন, উক্ত বকেয়া বেতনের কারণে আমার উপর কোরবানি ওয়াজিব। কিন্তু তারপরও তখন আমার নিকট টাকা না থাকার কারণে আমি কোরবানি করিনি। এখন জানার বিষয় এই যে, উক্ত বকেয়া বেতনের কারণে কি আমার উপর কোরবানি ওয়াজিব ছিল? ওয়াজিব হয়ে থাকলে গত কোরবানির সময় কোরবানি না করার কারণে আমার কি গুনাহ হয়েছে? বর্তমানে আমার করণীয় কি? আশা করি, সঠিক বিষয়টি জানিয়ে উপকৃত করবেন।

উত্তর: প্রশ্নের বর্ণনা অনুযায়ী আপনার বেতনের বকেয়া ৩০ হাজার টাকার কারণে আপনার উপর কোরবানি ওয়াজিব হয়নি। উক্ত বেতন উসূল হওয়ার পর থেকেই কেবল তার উপর যাকাত-কোরবানি ইত্যাদি বিধান প্রযোজ্য হবে। উসূলের আগে নয়। অতএব বিগত কোরবানির সময় কোরবানি না করার করারণে আপনি গুনাগার হবেন না। উল্লেখ্য যে, বেতন উসূল হওয়ার আগ পর্যন্ত তা কর্মচারীর একটি হক তথা প্রাপ্য হিসেবে গণ্য হয়। তাতে কর্মচারীর মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় না। আর যাকাত-কোরবানি ইত্যাদির সম্পর্ক মালিকানার সাথে। হক্বের সাথে নয়।

[বাদায়েউস সানায়ে ২/৯, ৪/৬১; মাবসূত, সারাখসী ২/১৯৬; হেদায়া ৩/২৭৮; আলবাহরুর রায়েক ২/২০৮, ৭/৩০০; আদ্দুররুল মুখতার ২/৩০৬; রদ্দুল মুহতার ৬/১০; জাদীদ মাসায়েল কে শরঈ আহকাম, মুফতী শফী রাহ. ৬৪-৬৫]

৩৩. প্রশ্ন: হজের মধ্যে যদি কেউ ১১ তারিখে কোরবানি করে এবং ১১ তারিখেই হালাল হয়ে যায় তাহলে তার উপর দম ওয়াজিব হবে কি?

উত্তর: না, এগারো তারিখ কোরবানি করার পর হালাল হলে দম দিতে হবে না। কারণ যিলহজ্বের ১০ থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত তিন দিনের যেকোনো দিন কোরবানি করা যায়। তবে যে দিনই কোরবানি করুক কোরবানির আগে মাথা মুন্ডানো যাবে না। কোরবানির পর মাথার চুল মুন্ডিয়ে বা ছেঁটে হালাল হতে পারবে।

[গুনইয়াতুন নাসিক পৃষ্ঠা : ১৭৫; রদ্দুল মুহতার ২/৫৩৮]

৩৪. প্রশ্ন: আমরা জানি যে, কারো নিকট প্রয়োজন অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে যাকাত (১ বছর অতিক্রম হলে) ও কোরবানি ওয়াজিব। এখন আমার জানার বিষয় হল, আমার এমন অনেক আত্মীয়স্বজন আছেন, যারা বাহ্যত গরীব। কষ্ট করে সংসার চলে। কিন্তু তারা ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে যেমন মেয়ের বিবাহ দেওয়া, ঘরবাড়ি বানানো ইত্যাদির জন্য বিভিন্ন বীমা ও ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে টাকা জমা দিয়ে আসছেন। যা ইতোমধ্যেই নিসাব পরিমাণ হয়ে গেছে। উল্লেখ্য, এই টাকা কিন্তু বর্তমানে তাদের প্রয়োজন অতিরিক্ত। এমতাবস্থায় তাদের উপর কোরবানি ও যাকাত ওয়াজিব হবে কি না এবং তাদের জন্য যাকাতের মাল খাওয়া বৈধ হবে কি না? সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে বাধিত করবেন।  

উত্তর: জমা টাকা নেসাব পরিমাণ হলে তা যে উদ্দেশ্যেই রাখা হোক তার উপর কোরবানি ওয়াজিব হবে এবং বছরান্তে উক্ত সম্পদের যাকাতও দিতে হবে। এমন ব্যক্তি যাকাত গ্রহণ করতে পারবে না। উল্লেখ্য, প্রচলিত বীমা কোম্পানিগুলোর লেনদেন সুদ ও জুয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত। তাই এতে অংশগ্রহণ করা সম্পূর্ণ হারাম।

[মাবসূত সারাখসী ২/১৮৯; আলমুহীতুল বুরহানী ৩/১৫৬, ৮/৪৫৫; বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬; আদ্দুররুল মুখতার ২/২৫৯, ৬/৩১২]

৩৫. প্রশ্ন: আমাদের গ্রামে কোরবানির গরুতে সাত ভাগের এক ভাগ তিন/চার জন গরীব ব্যক্তি মিলে দিয়ে থাকে। তাদের উপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। শুনেছি, যাদের উপর কোরবানি ওয়াজিব নয় তারা নাকি এভাবে কোরবানির পশুতে শরীক হতে পারে। সঠিক মাসআলা জানতে চাই।

উত্তর: আপনার শোনা কথাটি ঠিক নয়। এক গরুতে সাত জনের বেশি শরীক হওয়া বৈধ নয়। সাত জনের বেশি শরীক হলে কারো কোরবানি সহীহ হবে না। চাই অংশিদারগণ গরীব হোক বা ধনী। তাই কোরবানির পশুতে ঐভাবে শরীক নেওয়া যাবে না। একান্ত কখনো এমন করতে চাইলে এক ভাগের সকল অংশিদারগণ একজনকে মালিক বানিয়ে দিবে। অতপর ঐ ব্যক্তি নিজের পক্ষ থেকে ঐ অংশ কোরবানি দিবে। গোশত পাওয়ার পর অংশিদারদের মধ্যে গোশত বণ্টন করে দিতে পারবে।

[খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৫; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৬; মাজমাউল আনহুর ৪/১৬৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০৫; মাবসূত সারাখসী ১২/১২; আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৫]

৩৬. প্রশ্ন: আমাদের এলাকার মসজিদে ঈদের প্রথম জামাত সাড়ে সাতটায় শুরু হয়েছে। আর মাঠে শুরু হয়েছে আটটায়। যারা ঈদগাহে নামায পড়েছেন তারা প্রায় সকলেই মাঠের জামাত শেষে কোরবানি করেছেন। কিন্তু দু চার জনের কোরবানি এলাকার মসজিদের জামাতের পর তাদের ছেলে ও আত্মীয়দের পরামর্শে মাঠের জামাত শেষ হওয়ার আগেই জবাই করা হয়েছে। এখন অনেকেই বলছে, যেহেতু কোরবানিদাতাদের নামাযের আগে জবাই হয়েছে তাই তাদের কোরবানি আদায় হয়নি। এভাবে কিছু শরীকানা কোরবানি ঈদগাহে নামায আদায়কারী শরীকের নামায শেষ হওয়ার আগেই মসজিদের জামাতের পর জবাই করা হয়েছে।

উত্তর: প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে সকলের কোরবানি সহীহ হয়েছে। কোরবানিদাতা ঈদের নামায না পড়ে থাকলেও এলাকার যেকোনো স্থানে ঈদের জামাত হয়ে গেলেই কোরবানির পশু জবাই করা যায়। তবে ঈদের নামায পড়েই কোরবানি করা উত্তম।

[মাবসূত, সারাখসী ১২/১১; খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১১; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১১; মাজমাউল আনহুর ৪/১৭০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৫; রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৮; ফাতাওয়া রহীমিয়া ১০/৩৯]

৩৭. প্রশ্ন: এক ব্যক্তির একটি গরু আছে। সে মান্নত করেছে যে, আমি আল্লাহর ওয়াস্তে এ বছর গরুটি কোরবানি করব। লোকটি গরীব। বর্তমানে সে চাচ্ছে উক্ত গরুর পরিবর্তে আরেকটি গরু কিনে কোরবানি করবে। তার জন্য কি ওই গরুটির পরিবর্তে অন্য গরু কোরবানি করা জায়েয হবে?

উত্তর: তাকে ওই গরুটিই কোরবানি করতে হবে। এটা রেখে অন্য গরু কোরবানি করা জাযেয় হবে না।

[বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০২; মাজমাউল আনহুর ৪/১৭০; রদ্দুল মুহতার ৬/৩২১]

৩৮. প্রশ্ন: কোরবানির গরুতে আকীকার জন্য অংশ দেওয়া যাবে কি? আমরা স্বামী-স্ত্রীর পক্ষ থেকে কোরবানির দুই অংশ, মৃত বাবা-মার দুই অংশ এবং মেয়ে ও ছেলের আকীকার তিন অংশ-এভাবে এক গরুতে কোরবানি ও আকীকা করতে চাই। এটা জায়েয হবে কি?

উত্তর: হ্যাঁ, কোরবানির গরুর সাত ভাগে আকীকার অংশ দেওয়া জায়েয। এতে কোরবানি ও আকীকা দু’টোই আদায় হবে। আপনি  প্রশ্নে যেভাবে বলেছেন সেভাবে কোরবানি ও আকীকা করতে পারবেন।

[ফাতাওয়া খানিয়া ৩/৩৫০; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৯; মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা ৮/২৪৪; মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৪/৩৩১-৩৩৩; শরহুল মুহাযযাব ৮/৪০৬; রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৬]

৩৯. প্রশ্ন: কোনো ব্যক্তির উপর কোরবানি ওয়াজিব হয়নি। কিন্তু সে কোরবানির দিন আকীকা দিতে চায়। তার জন্য আকীকা দেওয়া বৈধ হবে কি না? একজন আলিম বলেছেন, কোরবানির দিনের ভিতর আকীকা দেওয়া এমন ব্যক্তির জন্য বৈধ নয়। প্রমাণসহ জানালে কৃতজ্ঞ হব।

উত্তর: কোরবানির দিন আকীকা করা নিষিদ্ধ নয়। এমনকি কোরবানির পশুতেও আকীকার অংশ দেওয়া জায়েয। অতএব কোরবানি ওয়াজিব নয় এমন ব্যক্তিও কোরবানির দিনগুলিতে আকীকা করতে পারবে। বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৯; রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৬

৪০. প্রশ্ন:জনৈকা মহিলার কাছে ৩ ভরি স্বর্ণালংকার আছে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু কাপড় আছে, যার মূল্য আনুমানিক পাঁচ হাজার টাকা। সে ঋণগ্রস্থও নয়। তার উপর কি কোরবানি ওয়াজিব হবে? খ) কোরবানির পশুকে জবাই করার জন্য শোয়ানোর সময় তার মাথা কোন দিকে থাকবে? উত্তর দিকে নাকি দক্ষিণ দিকে এবং পশুর পা কোন দিকে থাকবে? পূর্ব দিকে নাকি পশ্চিম দিকে?

উত্তর:ঐ মহিলার উপর কোরবানি ওয়াজিব। কারণ তার নিকট বিদ্যমান স্বর্ণ ও প্রয়োজনের অতিরিক্ত কাপড়ের মূল্য এক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য। যা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের চেয়ে বেশি। অতএব নেসবা পূর্ণ হওয়ায় তার উপর কোরবানি ওয়াজিব হবে।

[বাদায়েউস সানায়ে ২/১৫৮, ২০৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৯১; হেদায়া ১/২০৮; ফাতাওয়া খানিয়া ১/২২৭; ফাতহুল কাদীর ২/২১৮ খ) পশুকে জবাই করার সময় মাথা দক্ষিণ দিকে ও সীনা কিবলামুখী থাকবে। এতে পা পশ্চিম দিকে থাকবে। এভাবে শোয়ানো উত্তম।-উমদাতুল কারী ২১/১৫৭; ফাতহুল বারী ১০/২১; ইলাউস সুনান ১৭/১০০]

৪১. প্রশ্ন:আমরা জানি, হযরত ইবরাহীম আ.-এর কোরবানির ঘটনা তাঁর পুত্র হযরত ইসমাঈল আ.-এর সাথে হয়েছিল কিনা, কদিন আগে আমাদের এক স্যার যিনি ধর্ম পড়ান, বললেন যে, হযরত ইবরাহীম আ.-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল তাঁর পুত্র ইসহাক আ.-কে জবেহ করার জন্য। জানতে চাই, এক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য বক্তব্য কোনটি?

উত্তর:তাফসীরবিদ, হাদীস-বিশারদ ও ঐতিহাসিকগণের মতে নির্ভরযোগ্য মত হল হযরত ইবরাহীম আ.-এর কোরবানির ঘটনা তাঁর স্ত্রী হযরত হাজেরা রা.-এর গর্ভের পুত্র হযরত ইসমাঈল আ.-এর সাথে হয়েছিল। আলকুরআনের বর্ণনাভঙ্গি এদিকেই ইঙ্গিত করে। কুরআন মজীদের একটি আয়াত (তরজমা) আমি তাকে ইসহাকের জন্মলাভের সুসংবাদ দিলাম এবং ইসহাকের পরবর্তীতে ইয়াকুবেরও। (সূরা হুদ : ৭১) উক্ত আয়াতে এ কথার ইঙ্গিত রয়েছে যে, যার ব্যাপারে কোরবানির আদেশ করা হয়েছিল তিনি হযরত ইসহাক আ. নন। কারণ উক্ত আয়াতে স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়েছে যে, ইসহাক আ. জীবিত থাকবেন। তাঁর ঔরসে ইয়াকুব আ. জন্ম লাভ করবেন। যদি ইসহাক আ.-এর সাথে কোরবানির ঘটনা ঘটত তাহলে তাঁর সম্পর্কে উক্ত কথা বলা হত না। কেননা, যার ব্যাপারে কোরবানি করার আদেশ করা হয়েছে তাঁর ব্যাপারে উক্ত কথা বললে কোরবানির মাধ্যমে পরীক্ষা নেওয়ার কোনো অর্থ থাকে না। এছাড়া আরো বহু দলীল-প্রমাণ দ্বারা প্রমাণিত যে, কোরবানির ঘটনা ইসমাঈল আ.-এর সাথে হয়েছিল। ইসহাক আ.-এর সাথে নয়। এটিকে ইসহাক আ.-এর সাথে যুক্ত করা ঠিক নয়।

৪২. প্রশ্ন:কোরবানির পশু ক্রয় করার পর যদি মারা যায় অথবা চুরি হয়ে যায় তাহলে কি আরেকটি পশু ক্রয় করে কোরবানি করতে হবে?

উত্তর:ঐ ব্যক্তি যদি ধনী হয়ে থাকে যার উপর কোরবানি ওয়াজিব হয় তাহলে তাকে অন্য পশু ব্যবস্থা করে কোরবানির সময়ের মধ্যে কোরবানি করা ওয়াজিব হবে। আর যদি সে এমন গরীব হয় যার উপর কোরবানি ওয়াজিব নয় সেক্ষেত্রে তাকে আর কিছুই করতে হবে না।

[সুনানে কুবরা বায়হাকী ৯/২৮৯; মাজমাউল আনহুর ৪/১৭৩; বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৯; ফাতাওয়া খানিয়া ৩/৩৪৭; আলমুহীতুল বুরহানী ৮/৪৫৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৯; আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২৫]

৪৩. প্রশ্ন:এক বিত্তবান ব্যক্তি কোরবানির এক মাস পূর্বে একটি কোরবানি মান্নত করে। কোরবানির দিন সে শুধু একটি কোরবানি করে। জানার বিষয় হল, উক্ত কোরবানির দ্বারা তার মান্নত আদায় হয়েছে কি না?

উত্তর:প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তির উপর দুটি কোরবানি করা জরুরি ছিল। ১. সাধারণ ওয়াজিব কোরবানি ও ২. মান্নতের ওয়াজিব কোরবানি। যেহেতু সে একটি কোরবানি করেছে তাই এখন কোরবানির উপযুক্ত একটি পশুর মূল্য সদকা করে দিতে হবে। আর সময়মতো কোরবানি না করার কারণে ইস্তিগফার করতে হবে।

[বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৪-১৯৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯১; হাশিয়াতুত তাহতাবী আলাদ্দুর ৪/১৬৮; মাবসূত সারাখসী ১২/৯]

৪৪. প্রশ্ন:আমি কোরবানির সময় আমার মরহুম আব্বার পক্ষ থেকেও কোরবানি দিতে ইচ্ছুক। প্রশ্ন হচ্ছে, এ কোরবানির গোশত কি সদকা করে দিতে হবে?

উত্তর:না। মৃতের রূহে ছওয়াব পৌঁছানোর জন্য যে কোরবানি করা হয় এর গোশত সদকা করে দেওয়া জরুরি নয়। এ গোশত নিজের কোরবানির মতো নিজে খেতে পারবে এবং অন্যকেও দিতে পারবে।

[ফাতাওয়া খানিয়া ৩/৩৫১; ফাতাওয়া বাযযাযিয়া ৬/২৯৫; আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২৬; তাবয়ীনুল হাকায়েক ৬/৮; আলমুহীতুল বুরহানী ৮/৪৭৩]

৪৫. প্রশ্ন: প্রতি বছর আমরা ছয় ভাই একটি গরু কোরবানি করি। একটি গরুতে যেহেতু সাতজন শরিক হতে পারে তাই এবার আমরা পশুর ৭ম ভাগটি ইছালে ছওয়াবের উদ্দেশে মৃত পিতার পক্ষ থেকে কোরবানি দিতে চাচ্ছি। এভাবে মৃত পিতার পক্ষ থেকে কোরবানি করলে তা সহীহ হবে কি এবং ঐ অংশের গোশত কি আমরা খেতে পারব?

উত্তর: হ্যাঁ, প্রশ্নোক্ত অবস্থায় ৬ জন মিলে ৭ম অংশ পিতার পক্ষ থেকে কোরবানি করলে তা সহীহ হবে এবং আপনারা ঐ অংশের গোশত খেতে পারবেন। তবে এটি উত্তম পদ্ধতি নয়। এক্ষেত্রে উত্তম হল, সবাই মিলে এক অংশের টাকা এক ভাইকে মালিক বানিয়ে দিবে। আর ঐ ভাই পিতার পক্ষ থেকে কোরবানি করবে। এতে কাজটি নিয়মসম্মত হবে এবং সকলে সওয়াবও পেয়ে যাবে। আর এ অবস্থায়ও মৃত পিতার পক্ষ থেকে দেওয়া অংশের গোশত কোরবানিদাতার হবে। সে তা নিজেও খেতে পারবে, সদকাও করবে পারবে এবং অন্য শরিককে হাদিয়াও দিতে পারবে।

[সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ১৮৫; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৯; আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২৬; আলমুহীতুল বুরহানী ৮/৪৭৮]

৪৬. প্রশ্ন : কোরবানির পশু হারিয়ে গেলে কী করতে হবে?

উত্তর : সামর্থ্যবান ব্যক্তি (যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব) কোরবানির পশু ক্রয়ের পর তা হারিয়ে গেলে আরেকটি কোরবানি দিতে হবে। আর যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়, তিনি কোরবানির জন্য ক্রয়ের পর তা হারিয়ে গেলে আরেকটি কোরবানি করা লাগবে না।

৪৭. প্রশ্ন : মান্নতের কোরবানির গোশত কারা খেতে পারবে?

উত্তর : মান্নতের কোরবানির গোশত মান্নতকারী নিজে খেতে পারবে না। কোনো ধনী ব্যক্তিও খেতে পারবে না। দরিদ্রদের দান করে দিতে হবে।

৪৮. প্রশ্ন : সৌদি আরবে বাংলাদেশের একদিন আগেই ঈদ হয়। কোনো সৌদি প্রবাসী যদি তার কোরবানি বাংলাদেশে করতে বলেন তাহলে সৌদি আরবে যেদিন ঈদুল আজহা হবে সেদিন কি বাংলাদেশে তার কোরবানি করা যাবে?
উত্তর : না। বাংলাদেশের কোরবানির দিনগুলোতেই কোরবানি করতে হবে।

(মাজমাউল আনহুর, ৪/১৭০, ফতিহুল কাদীর ৯/৫২৬, শামী ৯/৩৮৬)।

৪৯. প্রশ্ন : নাবালেগের সম্পদ থাকলে তার ওপর কি কোরবানি ওয়াজিব হবে?

উত্তর : না। নাবালেগ সম্পদশালী হলেও তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে না। নাবালেগের পিতা ও নাবালেগের পক্ষ থেকে কোরবানি করা ওয়াজিব নয়।

(মাহমুদিয়া ২৬/২৪০)।

৫০. প্রশ্ন : কোনো সামর্থ্যবান ব্যক্তি (যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব) যদি একাধিক কোরবানির পশু কেনেন তাহলে কি সবগুলোই কোরবানি করা তার জন্য ওয়াজিব?

উত্তর : যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব তিনি কোরবানির জন্তু কিনলেও সেটাই কোরবানি করা তার ওপর ওয়াজিব নয়। বরং অন্যটা কোরবানি করাও তার জন্য জায়েজ। একাধিক কোরবানির জন্তু কিনলেও সব কোরবানি করা তার জন্য ওয়াজিব নয়। যে কোনো একটা বা অন্য আরেকটা কোরবানি করলেও চলবে, তবে যে জন্তুটি বা যে জন্তুগুলো কিনেছেন সেটি বা সেগুলো কোরবানি করাটাই উত্তম।

(ফাতহুল কাদীর ৯/৫২০)।

৫১. প্রশ্ন : অন্যের পক্ষ থেকে তার অনুমতি ছাড়াই কোরবানি করলে কি তার ওয়াজিব আদায় হবে?

উত্তর : না। অনুমতি ছাড়া অন্যের কোরবানি করলে তার ওয়াজিব আদায় হবে না। (মাহমুদিয়া ২৬/২৫২)।

৫২. প্রশ্ন : কোরবানি কোন দিন করা উত্তম?

উত্তর : ঈদুল আজহার দিন এবং পরের ২ দিন মোট ৩ দিন কোরবানি করা যায়। তবে ঈদুল আজহার দিন কোরবানি করাই উত্তম। তারপর ১১ জিলহজ এবং সর্বশেষ ১২ জিলহজ।

[ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া, ২৬/৩৩৭)]

৫৩. প্রশ্ন: প্রতি বছর আমরা নির্দিষ্ট পাঁচ শরিক মিলে কোরবানি করি। এ বছরও কোরবানির এক সপ্তাহ আগে ৫জন মিলে একটি গরু ক্রয় করি। কোরবানির আগের দিন আমাদের এক প্রতিবেশী তাতে শরিক হতে চাইলে আমরা তাকে শরিক করে নিই। জানার বিষয় হল, এভাবে শরিক করার কারণে আমাদের কোরবানি আদায়ে কোনো ত্রুটি হয়েছে কি না? জানালে উপকৃত হব। উল্লেখ্য, কোরবানি দাতা প্রত্যেক শরিকই সচ্ছল এবং নেসাব পরিমাণ মালের মালিক।

উত্তর: প্রশ্নোক্ত অবস্থায় সকলের কোরবানি সহীহ হয়েছে। তবে পাঁচ জনে মিলে কোরবানি দেওয়ার নিয়তে পশু ক্রয়ের পর নতুন করে শরিক নেওয়া অনুত্তম হয়েছে। এক্ষেত্রে ঐ শরিক থেকে প্রাপ্য টাকা সদকা করে দেওয়া উত্তম। অবশ্য সদকা না করলেও কোনো সমস্যা নেই।

[বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১০; আদ্দুররুল মুখতার ৬/৪১৭; মাবসূত, সারাখসী ১২/১৫]

৫৪. প্রশ্ন: কোরবানি কার উপর ওয়াজিব? কী পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে একজনের উপর কোরবানি ওয়াজিব হয়?

উত্তর: প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, যে ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার উপর কোরবানি করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কোরবানির নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য।

আর নিসাব হল স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি, টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্ত্তর ক্ষেত্রে নিসাব হল এর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্ত্ত মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার উপর কোরবানি করা ওয়াজিব।

[আলমুহীতুল বুরহানী ৮/৪৫৫; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৭/৪০৫]

গ্রন্থনা ও সম্পদনা : মাওলানা মিরাজ রহমান