বুক জ্বালাপোড়ার কারণ ও প্রতিরোধের উপায়

টিউন করেছেন adhora | August 3, 2014 08:59 | পোস্টটি 1,269 বার দেখা হয়েছে

বুক জ্বালাপোড়ার কারণ ও  প্রতিরোধের উপায়


শারীরিক সমস্যার মধ্যে বুক জ্বালাপোড়া একটি বড় সমস্যা। এই সমস্যা অনেকেরই দেখা যায়। কিন্তু এই বুক জ্বালাপোড়া করলে তাৎক্ষণিক কি ব্যবস্থা নেওয়া যায় সে বিষয়ে আমাদের অনেকেরই জানা নেই। বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতেই আজকের এই পোস্ট।

gastrik

আমাদের এই যান্ত্রিক জীবনে আমরা সবাই খুব ব্যস্ত। আমরা নিজেরাও অনেকটা যন্ত্রের মত হয়ে গেছি। আমাদের দেহটা একটা যন্ত্রই বলা যায়। দেহের কোথাও কোন সমস্যা হলে তার প্রভাব পড়ে সারা শরীরে। আমাদের এই যান্ত্রিক জীবনের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ছোট বড় অনেক সমস্যা। তার মধ্যে একটি হলো বুক জ্বালাপোড়া বা Heart burn।

বর্তমানে এমন কোন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে একবারের জন্যও বুক জ্বালাপোড়া সমস্যায় ভুগে নাই। আপনাদের জন্য আমাদের আজকের প্রতিবেদন হচ্ছে বুক জ্বালাপোড়া। তাহলে আসুন আমরা স্বল্প পরিসরে জানার চেষ্টা করি বুক জ্বালাপোড়া কি? কি কারণে হয়? এবং কি হতে পারে এর প্রতিকার?
 

বুক জ্বালাপোড়া কি?

বুক জ্বালা পোড়া হচ্ছে-বুকের ভিতরের মধ্যবর্তী স্থান থেকে শুরু করে গলা পর্যন্ত জ্বালাকর অনুভুতি। এই জ্বালা কখনও কখনও শুধু বুকে আবার কখনও কখনও শুধু গলায় বা উভয় স্থানে হতে পারে। মাঝে মাঝে জ্বালার সাথে ব্যাথ্যা থাকতে পরে। মাঝে মাঝে কিছু তরল পদার্থ পাকস্থলী থেকে গলনালী দিয়ে মুখ চলে আসে, অর্থাৎ উল্টা পথে ধাবিত হয়, একে বলা হয় Gastro esophageal reflax.

বুক জ্বালপোড়ার কারণ কি?

Mengenal Gastritis

চিকিৎসা বিজ্ঞানের দীর্ঘ দিনের গবেষণায় বুক জ্বালাপোড়ার যে সকল কারণ বেরিয়ে এসেছে সেগুলো হচ্ছে -
# অ্যালকোহল সেবন করা।
# চা, কফি অতিরিক্ত মাত্রায় সেবন করা।
# কালো গোল মরিচ, সিরকা যুক্ত খাবার বেশি খাওয়া।
# তৈলাক্ত খাবার, ভাজাপোড়া বেশি পরিমাণে খেলে বুক জ্বালাপোড়া হয়।
# আচার, টমেটোর সস, কমলার রস, পেয়াজ, পিপারমেন্ট ইত্যাদি খাবার বুক জ্বালাপোড়া বাড়িয়ে দেয়।
# মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তাও বুক জ্বালাপোড়ার জন্য দায়ী।
# ধুমপান হচ্ছে বুক জ্বালাপোড়ার আরও একটি অন্যতম কারণ।
# পিত্ত থলিতে পাথর থাকলেও বুক জ্বালাপোড়া হয়।
# পাকস্থলীর উপর চাপ পড়লে বুক জ্বালাপোড়া হয়। পাকস্থলীর উপর চাপ বলতে বুঝায়- এক সাথে বেশি পরিমাণ খাওয়া, স্থুলতা, গর্ভাবস্থা, শক্ত ও মোটা বেল্টের প্যান্ট পড়া ইত্যাদি।
এখন অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে বুক জ্বালাপোড়ার লক্ষণ কি কি হতে পারে। আপনি কিভাবে বুঝবেন যে আপনি আসলেই বুক জ্বালাপোড়ায় ভুগছেন।

 বুক জ্বালাপোড়ার লক্ষণ:

# পেটের উপরের দিকে মৃদু ব্যথ্যা হওয়া।
# বুকে ব্যথ্যা হওয়ার সাথে জ্বালা ভাব থাকে।
# বুক জ্বালা কখনও খাবার গ্রহণের পরে হয়। আবার কারও কারও ক্ষেত্রে পেট খালি থাকলে হয়।
# মাঝে মাঝে ঢেকুর উঠে।
# বুক ব্যাথ্যা – এটি হচ্ছে বুক জ্বালার একটি লক্ষণ। পাকস্থলীর এসিড সম্প্রসারিত হয়ে খাদ্যনালীর উপর পর্যন্ত চলে আসে এবং বুকে ব্যথ্যা ও জ্বালা হয়। এই ব্যাথ্যা ও জ্বালা কখনও স্বল্পস্থায়ী আবার কখনও দীর্ঘস্থায়ী হয়। বুকের ব্যথ্যা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় ও বাম বাহুতে চলে আসে এবং ব্যায়াম করার সময় বৃদ্ধি পায়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যাবেন।
# বিশ্রামের সময় বুক জ্বালাপোড়া ও ব্যাথ্যার বৃদ্ধি হয়। আমরা যখন শুয়ে থাকি বা আধো শোয়া অবস্থায় থাকি তখন এসিড খাদ্যনালী দিয়ে উপরে উঠে আসে। ফলে বুক জ্বালাপোড়া হয়। Dr. Coyle এর মতে, আমরা যখন সোজা হয়ে বসে থাকি তখন মধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে খাদ্যবস্তুসমুহ পাকস্থলীতে থাকে, তাই বুক জ্বালাপোড়া কম হয়।
# মুখে তিতা স্বাদ অনুভুত হওয়া। এই ঘটনা সকালের দিকে বেশি ঘটে।
# স্বরভঙ্গ – স্বরভঙ্গ হচ্ছে বুক জ্বালপোড়ার একটি অস্বাভাবিক লক্ষণ। ঠাণ্ডা
লাগার প্রথম অবস্থায় যে রকম হয় ঠিক সে রকম হয়। অমস্ন বা এসিড গলা পর্যন্ত উঠে আসার কারণে এরকম হয়। এসিড কন্ঠস্বরকে ভারি করে তোলে।
# গলায় ক্ষত – বুক ও গলা জ্বালার সাথে গলায় ক্ষত হয়। মনে হয় যেন গলা ছিলে গেছে। এসিড খুব ক্ষতকারী তাই এই রকম হয়। খাদ্য গ্রহণের পরপর এ রকম হলে বুঝতে হবে এটা বুক জ্বালাপোড়ার সাথে সম্পৃক্ত।
# খাদ্য গ্রহণের পরপর কাশি শুরু হয়। পাকস্থলীর এসিড ফুসফুস পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে, বুক জ্বালার সাথে সাথে শ্বাসপ্রশ্বাসে অসুবিধা হয়।
# বমিবমি ভাব ও বমি হতে পারে। মুখে অতিরিক্ত লালা উঠতে থাকে।
# দীর্ঘ দিন যাবৎ বুক জ্বালাপোড়া চলতে থাকলে এসিডের কারণে খাদ্যনালী সংকুচিত হয়ে যায়। ফলে খাবার গিলতে কষ্ট হয়।

বুক জ্বালাপোড়া কিভাবে প্রতিরোধ করা যায়:

h1

একটি কথা প্রচলিত আছে যে, Prevention is batter then cure অর্থাৎ রোগ হওয়ার আগেই সচেতন হওয়া ভাল। ওষুধ ব্যতীত বুক জ্বালাপোড়া থেকে মুক্তি পেতে হলে কিছু নিয়ম মেনে চলা আমাদের সবার জন্য দরকার। নিয়ম গুলো হলো:
> যেসব খাবার ও পানীয় খেলে আপনার বুক জ্বালাপোড়া করে সেগুলো চিহ্নিত করুন এবং এড়িয়ে চলুন।
> ধুমপান বর্জন করুন।
> একসাথে বেশি পরিমাণে না খেয়ে কিছুক্ষণ (২ ঘণ্টা) পরপর অল্প অল্প করে খান। তাহলে খাবার দ্রুত হজম হবে। এবং পেটে অতিরিক্ত গ্যাস ও এসিড উৎপন্ন হবে না। এর পরিনামে আপনি বুক জ্বালাপোড়া হতে রেহাই পাবেন।
> খাওয়ার পরপর শুয়ে পড়বেন না, ব্যায়াম করবেন না। ১ ঘন্টা অপেক্ষা করুন, তারপর ঘুমুতে যান।
> ঘুমানোর সময় বিছানা থেকে মাথাকে ৪ থেকে ৬ ইঞ্চি উচুতে রেখে শয়ন করুন।
> শরীরের বাড়তি ওজন কমিয়ে ফেলুন।
> ঢিলেঢালা পোশাক পরুন। মোটা বেল্টের প্যান্ট পড়বেন না।
> মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে চেষ্টা করুন।

গর্ভাবস্থায় বুক জ্বালাপোড়া

গর্ভাবস্থায় বুক জ্বালাপোড়া এবটি সাধারন ও স্বভাবিক শরীরবৃত্তীয় ঘটনা বলা যায়। গর্ভাবস্থার চতুর্থ মাস থেকে বুক জ্বালাপোড়া শুরু হতে থাকে। হরমোনের মাত্রার পরিবর্তনের ফলে বুক জ্বালাপোড়া হয়। যার কারণে সমগ্র খাদ্যনালী ও পাকস্থলীর পেশীতে খাবারের বিভিন্নতার কারণে প্রতিক্রিয়া হতে পারে। প্রেগনেনসি হরমোনের (HCG) কারণে খাদ্যনালীর ভাল্ব শিথিল হয়ে যায়, যার কারণে পাকস্থলীর খাদ্যবস্তু ও পাকস্থলীতে সৃষ্ট এসিড গলনালীর গিকে ধবিত হয়। ফল স্বরূপ বুক জ্বালাপোড়া হয়। এছড়াও জরায়ুর বৃদ্ধির কারণে পাকস্থলীর উপর চাপ পড়ে। তাই খাদ্যবস্তু ও এসিড গলনালীর দিকে যায় এবং বুব জ্বালাপোড়া হয়।
প্রতিরোধ: গর্ভস্থ শিশু এবং নিজেকে এ থেকে মুক্ত রাখতে হলে নিচের নির্দেশনা সমুহ অনুসরন করতে পারেন।
* এক সাথে বেশি পরিমাণে না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার খান। খাবার ধীরে ধীরে ভালভাবে চিবিয়ে খান। এতে খাবার দ্রুত ও ভালভাবে হজম হবে।
* বুক জ্বালাপোড়া বৃদ্ধি করে এমন খাবার বর্জন করুন। যেমন – ভাজাপোড়া, অধিক মসলা যুক্ত খাবার, টক জাতীয় খাবার, সস ইত্যাদি।
* খাওয়া সময় পানি কম পান করবেন। খাওয়ার সময় পানি বেশি খেলে খাবার হজমে সহায়তাকারি হাড্রক্লোরিক এসিড পাতলা হয়ে যায়। ফলে খাবার হজমে সমস্যা হয় এবং এসিডকে উপরের দিকে চাপ দেয় ও বুক জ্বালাপোড়া বৃদ্ধি করে।
* খাওয়া শেষ করে সাথে সাথে শুয়ে পড়বেন না।
* ঘুমানোর সময় বিছানা থেকে মাথাকে ৪ থেকে ৬ ইঞ্চি উচুতে রেখে শয়ন করুন।
* ঢিলেঢালা পোষাক পরম্নন। আঁটসাঁট পোষাক পাকস’লী ও তলপেটে চাপ সৃষ্টি করে সমস্যার বৃদ্ধি ঘটায়।
* কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করুন।
গর্ভাবস্থায় বুক জ্বালাপোড়া শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়া পরে ভাল হয়ে যায়। এর পরেও কো সমস্যা থাকলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিবেন।
সতর্ক বার্তা: গর্ভাবস্থায় ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে কোন ঔষধ খাবেন না।