ডাক্তারের সিরিয়াল পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা আর নয়! প্রযুক্তি নিয়ে এসেছে সমাধান!

অপ্রস্তুত আযহার

মীর আযহার আলি। পেশায় একজন ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট। পাশাপাশি অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও অন্যান্য বিষয়ে ব্লগে লেখালেখি করছেন। সাম্প্রতিক বিশ্বে ঘটে যাওয়া প্রত্যেকটি বিষয়ে তিনি আপডেট থাকতে পছন্দ করেন। তার বিভিন্ন লেখাগুলো পড়বে পারবেন জেনেসিসব্লগ, টেকটিউনস এবং সামহোয়ারইন ব্লগ থেকে।
টিউন করেছেন অপ্রস্তুত আযহার | February 15, 2017 07:41 | পোস্টটি 887 বার দেখা হয়েছে

বাসায় কারো অসুখ হলে সবচেয়ে বড় যে দুশ্চিন্তা দাঁড়ায় আমার, তা হলো – ডাক্তারের সিরিয়াল কখন পাব? ভালো একজন ডাক্তারের সিরিয়াল পাওয়ার জন্য প্রায় এক মাস অপেক্ষা করতে হয়। এক মাস মানে বোঝেন? রোগীর এর মধ্যে কি অবস্থা হতে পারে আন্দাজ করুণ! একটা মজার জোকস আছে এই নিয়ে। জোকসটা অনেকটা এই রকমঃ

এক ভদ্রমহিলা খুব ব্যস্ত একজন ডাক্তারকে ফোন করে বললেন, “ডাক্তার সাহেব, আমার ছেলের খুব অসুখ। আপনার সিরিয়াল কি পাওয়া যাবে?”

ডাক্তার বললেন, “এই মাসেই কোন সিরিয়াল বাকি নেই , আপনি আগামী মাসে ফোন দিয়েন”।

মা আতংকিত কণ্ঠে বললেন, “ডাক্তার সাহেব! ছেলেটা তো খুব অসুস্থ, এর মধ্যে যদি কিছু হয়ে যায়?”

ডাক্তার নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে দিলেন, “সেটা নিয়ে আপনাকে টেনশন করতে হবে না। চাইলে আপনি যেকোনো সময় সিরিয়াল বাতিল করতে পারেন”।

নিশ্চয়ই জোকস পড়ে খুব হাসছেন আপনি? আরে ভাই, এই বিষয়টা তো এখন আর শুধু জোকস নেই! বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা চরম বাস্তবতা! আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার এমনই বেহাল দশা যে এই ধরনের জোকস শুনে না হেসে, উচিত কান্না করা। আপনি অসুস্থ? চিকিৎসা প্রয়োজন? ভালো ডাক্তার দেখাবেন? জানেন কত দিন লাগবে ডাক্তারের সিরিয়াল পেতে? ততদিনে আপনার কি অবস্থা হতে পারে?

ডাক্তারের সিরিয়াল এবং একটি কঠিন বাস্তবতা

জোকস তো শুনলেন, এবার একটা বাস্তব উদাহারন দেই শুনুন। পরিচিত এক আপুর মুখে সেদিন একটা ঘটনা শুনলাম –

এলিফ্যান্ট রোডে একটা ফার্মেসিতে গিয়েছি ওষুধ কিনবো বলে। সেখানে এক আপুর সাথে অনেক দিন পরে দেখা। মাধুরী আপু, হাজব্যান্ডের সাথে থাকেন বনশ্রীতে, এখানে মায়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন। আপু প্রেসার চেক করালেন ফার্মেসি থেকে। প্রেসার খুব কম।

আমি জিজ্ঞেস করলাম- “আপু অসুস্থ নাকি আপনি?’

মাধুরী আপু একটু হেসে জবাব দিলেন – “হ্যা, একটু তো অসুস্থ”।

কথায় কথায় জানলাম মাধুরী আপু তিন মাসের প্রেগনেন্ট। সব কিছু ঠিকই ছিল, হঠাৎ করে কিছুদিন যাবত প্রেসার খুব আপ ডাউন করছে।

আমি আপুকে বললাম, “আপু ডাক্তার দেখান, এই সময়ে প্রেসার আপ ডাউন করা তো খুব খারাপ”।

আপু বললেন, “ডাক্তারের সিরিয়াল দিয়েছি। আগামি সপ্তাহে দেখাতে পারব”।

মাধুরী আপুর কথা শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম! বলছেন কি উনি? উনি প্রেগনেন্ট, প্রেসার আপ ডাউন করছে খুব। যেকোনো মুহূর্তে ক্রিটিক্যাল প্রবলেম হতে পারে। অথচ ডাক্তারের সিরিয়ালের জন্য এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে?

আপু জানালেন তিনি ইবনে সিনার কোন এক বিখ্যাত গাইনি ডাক্তারকে দেখান। সেই ডাক্তার এর সিরিয়াল পাওয়া খুব কঠিন। ১০ – ১২ দিন আগে সিরিয়াল পাওয়া যায় না। আর এই সব ক্রিটিক্যাল সমস্যায় একটু নাম করা অভিজ্ঞ ডাক্তার দেখানোই ভাল। অনভিজ্ঞ বা নতুন ডাক্তার দেখাতে গেলে চিকিৎসার উল্টো রিএকশন হতে পারে। কথাটা শুনে আমার খুব খারাপ লাগল। অসুখে ডাক্তার দেখানোর জন্য ১০ দিন অপেক্ষা করতে হবে! এই ১০ দিনের মধ্যে রোগীর যেকোনো বড় ধরণের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে!

ডাক্তারের সিরিয়াল সমস্যার প্রযুক্তিগত সমাধান

আপুর মুখে ঘটনাটা শোনার পর আমি অনেক চিন্তা করলাম এরপর। এভাবে চলতে থাকলে তো ডাক্তারের কাছে পৌঁছানোর আগেই অনেক রোগী মারা যেতে পারে। এই সমস্যার একটা সমধান হওয়া প্রয়োজন। দু একজন বন্ধুর সাথে কথা বলে জানলাম যে ইতিমধ্যে সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে! সেটা হচ্ছে – অনলাইনে সিরিয়াল দেওয়ার সুযোগ! বড় বড় ডাক্তাররা অনলাইনে বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা ভিত্তিক ওয়েবসাইট থেকে সিরিয়াল নিয়ে থাকেন ইমার্জেন্সি ক্ষেত্রে। ডাক্তারের সিরিয়াল যত লম্বাই হোক না কেন, আপনার জন্য অনলাইনে সিরিয়াল দিয়ে দুই তিন দিনের মধ্যে ডাক্তারকে দেখানোর সুযোগ রয়েছে। তাতে সামান্য কিছু এক্সট্রা ফি রাখছে অনলাইন সাইটগুলো। এক বন্ধু আমাকে ইহাসপাতাল সাইটের (www.ehaspatal.com) কথা বললেন। এই সাইটটা বানিয়েছে কিছু নিবেদিত প্রান মানুষ যাদের উদ্দেশ্য সাধারন মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া।

আমি ওদের সাইট ঘুরে কাস্টোমার কেয়ার এর নাম্বারটা নিলাম। তারপর নাম্বারটা পাঠিয়ে দিলাম মাধুরী আপুকে। মাধুরী আপু আমার দেয়া নাম্বারে ফোন দিয়ে স্বাস্থ্য পরামর্শ চাইলেন। ওদের বিশেষজ্ঞরা আপুকে এই অবস্থায় বেশ কিছু দরকারি স্বাস্থ্য পরামর্শ দিলেন, এবং দু দিনের মধ্যেই একজন বিখ্যাত গাইনি ডাক্তারের সিরিয়াল এর ব্যবস্থা করে দিলেন। মাত্র ১০০ টাকা এক্সট্রা চার্জ দিতে হলো। এবং ওদের ভালো সার্ভিস পেয়ে আপু নিজেও হতবাক! এখন উনি পরিচিত অনেক লোককে এভাবে অনলাইনে বা ফোন করে সিরিয়াল দিতে উৎসাহিত করছেন।

এই তো গেল কেবল ডাক্তারের সিরিয়াল দেওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে এই মুহূর্তে কতগুলো স্বাস্থ্য পরামর্শ মুলক ওয়েবসাইট আছে জানেন? সংখ্যাটা ১০০ এর কাছাকাছি হবে। বেশিও হতে পারে। এরা প্রতিমুহূর্তে স্বাস্থ্য ভাল রাখার নানান উপায় নিয়ে আপডেট দিচ্ছে। ইহাসপাতাল ব্লগ এই ক্ষেত্রে অনেক হেল্প করছে । তারা হেলথ টিপস, স্বাস্থ্যজ্ঞান, ডায়েট পরামর্শ, রোগ প্রতিরোধ ইত্যাদি বিষয়ে নিত্য নতুন আপডেট দিচ্ছে। এইছাড়াও বেশ কিছু ফেসবুক পেইজ আছে এই নিয়ে রেগুলার পোষ্ট করে। তাছাড়া অনেক হসপিটাল ডিরেক্টরি আছে যেখানে হাসপাতাল নিয়ে দরকারি তথ্য পাবেন। বেশ কিছু ইকমার্স সাইট হয়েছে যেখান থেকে অনলাইনে ওষুধ অর্ডার করলে ভালো মানের ঔষধ পৌঁছে দেবে আপনার বাড়িতে! এভাবে প্রযুক্তি আমাদের স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন সমস্যার একের পর এক সমাধান নিয়ে এগিয়ে আসছে।

অনলাইন হাসপাতাল এর আবির্ভাব ও স্বাস্থ্যসেবা খাতের ডিজিটালাইজেশন

এই ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে স্বাস্থ্যসেবা খাতের ডিজিটালাইজেশন এর ক্ষেত্রে দারুণ কার্যকরী ভুমিকা রাখবে। শুধু ehaspatal নয়। আরও বেশ কিছু ওয়েবসাইট এই ক্ষেত্রে কাজ শুরু করেছে। যেমনঃ Doctorolla.com, healthprior21, rx71.co, doctorsbd.com, healthcarebd.com, qtaker.com ইত্যাদি। এদের মধ্যে আমি ehaspatal আর rx21 কে এগিয়ে রাখব এই কারণে যে তারা ডাক্তারের সিরিয়াল এর পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শ, রোগ নির্ণয়, স্বাস্থ্য টিপস ইত্যাদি বিনামূল্যে দিচ্ছে। তাছাড়া অনেক সাইটের আছে হাসপাতাল ডিরেক্টরি যেখানে দেশের বিভিন্ন স্থানের হাসপাতালের বিস্তারিত ঠিকানা, খরচাপাতি এবং সুযোগ-সুবিধার বিবরন ইত্যাদি দেওয়া আছে। আর এদিকে ehaspatal তো আরও এগিয়ে। তাদের আছে ঔষধ সরবরাহ করার অনলাইন সার্ভিস। অনলাইনে যেকোনো জরুরী ঔষধ অর্ডার করলে পৌঁছে যাবে আপনার বাসায়।

এখন অনেকেই মনে করতে পারেন যে, এদের সার্ভিস তো সম্পূর্ণ ফ্রি না! টাকা নিচ্ছে কাজের বদলে। আরে ভাই, বাংলাদেশে বাস করে কি নিজের লাভের কথা না ভেবে কার উপকার করার উপায় আছে? চাকরি বাকরি বিজনেস ফেলে যদি আমি সমাজের সেবা করতে থাকি তাহলে পেট চলবে? যদিও এই ওয়েবসাইটগুলো মূলত হেলথ সার্ভিস বিজনেস করছে, কিন্তু এখানে বিজনেসের মাধ্যমে তারা সমাজের উপকার করছে। এটা সত্যিই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। আমি একটা কাজ করছি, পয়সা উপার্জন করছি এবং আমার কাজের ফলে মানুষ উপকার পাচ্ছে। এর চেয়ে মহান বিজনেস আর কি হতে পারে?

আপনার আমার করনীয়

আশা করবো এর পর থেকে আপনারা যেকোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যায় এইসব অনলাইন সাইটগুলর সাহায্য নেবেন। আমরা রেগুলার সাইটগুলো ভিজিট করলে এবং তাদের সার্ভিস নিলে তারা আরও বেশি উৎসাহী হবে এই কাজে ডেডিকেশন বাড়াতে। এবং এর ফলে আমাদের স্বাস্থ্যগত সমস্যার সমাধানে প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ ঘটবে।

আজ এ পর্যন্তই থাক। আগামি কোন পোষ্টে আমরা নিজেরা কীভাবে অন্যদের স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার মাধ্যমে বিজনেস করতে পারি – তাই নিয়ে আলোচনা করবো। এইখাএ সম্ভবনা অনেক, দরকার শুধু সঠিক ধারণা ও দক্ষতার।