ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ক কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

টিউন করেছেন Saidur Mamun Khan | May 25, 2014 03:15 | পোস্টটি 638 বার দেখা হয়েছে

ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ক কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য


প্রযুক্তিতে বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে, এবং তার সাথে পরিবর্তন হচ্ছে কাজের বাজার। একসময়ে বাণিজ্য করতে যেখানে সুদূর সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে বিদেশ যেতে হত, এখন সময়ের পরিবর্তনে দেশে বসেই সারা বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে ব্যবসায় পরিচালনা হচ্ছে। শুধু তাই না, তৈরি পোশাকের মত একটি শক্ত ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম একটি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত আছে। তবে সময়ের সাথে পরিবর্তন আবশ্যক, এবং সেই ধারা অনুযায়ী আমরা আরেকটি পরিবর্তনের স্রোত ইদানীং লক্ষ করতে পারছি। এই পরিবর্তন হচ্ছে আইটি সেক্টরে আমাদের আনাগোনা, বিশেষ করে একটি আউটসোর্সিং সার্ভিস প্রদানকারী দেশ হিসেবে আমাদের এগিয়ে যাওয়া। বেসিসের তথ্য অনুযায়ী ২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে আইসিটি সেক্টরে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার, এবং এছাড়া ইল্যান্স এবং ওডেস্কের মত মার্কেটপ্লেস থেকে হয়েছে আরও ২২ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। এই সেক্টরে মুক্ত-পেশাজীবী বা ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করছেন হাজার হাজার তরুণ, যাদের ঘণ্টাপ্রতি আয় হচ্ছে ৩ থেকে ২৫-৩০ ডলার পর্যন্ত। এখন এই সম্ভাবনাময় খাত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পালা।

elace

 বিশ্বব্যাপী এবং বাংলাদেশে বর্তমান অবস্থা

বর্তমানে সারা বিশ্বে কাজের বাজারের আকার ৪২২ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যারা খুবই ছোট একটি অংশ, ১ বিলিয়ন ডলারের বাজার গতবছর ছিল অনলাইনে মার্কেটপ্লেসে। তবে আশার কথা হচ্ছে, গত কয়েক বছরে ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং ক্ষেত্রটি দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাজ্যের ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টের এক জরিপে বলা হয়েছে, ২০১১ সালে ২০০৮ সালের তুলনায় ১২ শতাংশ ফ্রিল্যান্সার বৃদ্ধি পেয়েছে। জনপ্রিয় অনলাইন মার্কেটপ্লেস ইল্যান্সে ২০১২ সালের প্রথম প্রান্তিকে ২ লাখের অধিক জব পোস্ট হয়। এটি বৃদ্ধি পেয়ে এ বছরের প্রথম প্রান্তিকে ৩ লাখে পৌঁছেছে। আমরা আশা করছি ২০১৮ সাল নাগাদ অনলাইন মার্কেটপ্লেস ৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যমানের বাজারে পরিণত হবে। শুধু তাই নয়, ২০২০ সাল নাগাদ বিশ্বে প্রতি ২ জন মানুষের ১ জন অনলাইন কাজের বাজারের সাথে যুক্ত থাকবে।

এই অগ্রগতির ছোঁয়া আমরা বাংলাদেশেও দেখছি। গত কয়েক বছরে যেভাবে আমাদের দেশের আইসিটি সেক্টর এগিয়ে যাচ্ছে, সেটা সত্যিই অভাবনীয়। এর প্রতিচ্ছবি আমরা ফ্রিল্যান্সিং সেক্টরেও দেখতে পাচ্ছি। ২০০৯ সালে আমাদের দেশ থেকে মূলত ফ্রিল্যান্সিংয়ের জোয়ার শুরু হয়, এবং মাত্র ৩-৪ বছরের মধ্যেই আমরা ফ্রিল্যান্স সার্ভিস প্রদানকারী দেশ হিসেবে অন্যতম অবস্থানে আছি। ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের অন্যতম দুটি অনলাইন মার্কেটপ্লেস ইল্যান্স এবং ওডেস্কে প্রায় ১৮০টি দেশের মাঝে আমরা যথাক্রমে ৭ম এবং ৮ম অবস্থানে ছিলাম, যেটা শুরুর দিকে অকল্পনীয় ছিল। এছাড়া আয়ের দিক থেকে ইল্যান্সে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের আয় হয়েছে প্রায় ৮.৫ মিলিয়ন (৮৫ লক্ষ) ডলার, এবং প্রায় ১৭০টি দেশের মধ্যে আয়ের দিক থেকে বাংলাদেশ ১৩তম অবস্থানে আছে। ইল্যান্স ডট কমে বাংলাদেশে বর্তমানে রেজিস্টার্ড ফ্রিল্যান্সার আছে প্রায় ৬০ হাজার, যার মধ্যে প্রায় ২৬ হাজার ফ্রিল্যান্সার ইল্যান্সে যোগ দিয়েছেন ২০১৩ সালে। এবং শুধু মার্কেটপ্লেসে যোগ দিয়েই নয়, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বিপুল পরিমাণে কাজ পেয়ে বেশ দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা। ২০১৩ সালে সর্বমোট ২২,০৯৭ টি কাজে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সাররা চুক্তিবদ্ধ হয়েছে, যেখানে ২০১২ সালে এই সংখ্যাটি ছিল মাত্র ১০,৯৬১, শতকরা হিসেবে সেটা ১০২ ভাগ বৃদ্ধি। এটি একটি ফ্রিল্যান্সার মার্কেটের জন্য অভূতপূর্ব অগ্রগতি। এবং এই অগ্রগতি আয়ের দিকে দিয়েও আমরা লক্ষ্য করেছি। ২০১২ সালে ইল্যান্স ডট কমে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের আয় ছিল প্রায় ১৬ কোটি ১৯ লাখ টাকার মত। ২০১৩ সালে এসে এদেশের ফ্রিল্যান্সাররা মোট আয় করেছে প্রায় ২৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকার মত, যা গত বছরের তুলনায় শতকরা ৬৯ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অগ্রগতির কারণে বিশ্বের উন্নত দেশের ক্লায়েন্টরাও বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ইল্যান্সে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সাররা সবচেয়ে বেশি কাজ পাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে, এবং এর পরেই দ্বিতীয় স্থানে আছে অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সার নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে প্রথম ৭টি দেশের মধ্যে বাকি স্থানগুলোতে আছে যুক্তরাজ্য, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জার্মানি, এবং নেদারল্যান্ডস।

 দেশে যে কাজগুলো আসছে

এই ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসগুলোতে বাংলাদেশ থেকে সাধারণত সব ক্যাটাগরির ফ্রিল্যান্সাররাই আসছে, তবে সবচেয়ে বেশি যোগ দিচ্ছে আইটি অ্যান্ড প্রোগ্রামিং, ডিজাইন, সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং, এবং অ্যাডমিন সাপোর্ট ক্যাটাগরিতে। ২০১২ সালে থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সবচেয়ে বেশী ফ্রিল্যান্সার নিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে অ্যাডমিনিস্ট্রিটিভ সাপোর্ট এ (১৯৫ শতাংশ) এবং মার্কেটিং এবং সেলস এ (১৮৫ শতাংশ)।

বাংলাদেশ থেকে ইল্যান্সে এই পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি কাজ পেয়েছে পিএইচপি জানা ফ্রিল্যান্সাররা। এর পরেই সেরা ১০টি স্কিলের তালিকায় আছে এইচটিএমএল, ওয়ার্ডপ্রেস, সিএসএস, মাইএসকিউএল, ফটোশপ, ইন্টারনেট মার্কেটিং, গ্রাফিক ডিজাইন, সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং, এবং ডাটা এন্ট্রি। তবে নতুন স্কিল হিসেবে দ্রুত উঠে আসছে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশান ডেভেলপমেন্ট (এনড্রয়েড এবং আইফোন)। এই ক্যাটাগরির ফ্রিল্যান্সারদের সম্মিলিত উপার্জন মার্কেটিং এবং গ্রাফিক ডিজাইনারদের থেকেও বেশি।

 জেলা পর্যায়ে অগ্রগতি

ফ্রিল্যান্স ক্যারিয়ারে অন্যতম একটি সুবিধা হল, এখানে কাউকে নির্দিষ্ট কোন স্থানে সীমাবদ্ধতায় আটকে থাকতে হয়না। আগে যেখানে ভালো চাকরি করতে হলে রাজধানী ঢাকায় আসা ছাড়া অন্য কিছু চিন্তা করা যেত না, এখন সেই চিন্তাধারার পরিবর্তন হচ্ছে। একজন দক্ষ ব্যক্তি দেশের যেখানেই হোক না কেন, নিজের জেলা, নিজের বাড়িতে বসেই সে সারা বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে। একই সাথে অবদান করতে পারছে নিজের জেলার স্থানীয় অর্থনীতিতে।  এরকমই উপার্জনের দিক দিয়ে ধীরে ধীরে উঠে আসছে ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা, যদিও এক্ষেত্রে এখনো বেশিরভাগ সফল ফ্রিল্যান্সার দেখা যাচ্ছে বিভাগীয় প্রধান শহরগুলোতেই। উপার্জনের দিক দিয়ে বাংলাদেশের সেরা ৭টি শহর হল ঢাকা, খুলনা, জামালপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, এবং বগুড়া।

elance bangladesh

 নারীদের জন্য ফ্রিল্যান্স ক্যারিয়ার

 ইল্যান্স-এর এক প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছে যে প্রযুক্তির সাথে জড়িত নারীরা অফিসিয়াল কাজের চেয়ে অনলাইনে কাজ করার সুযোগ বেশি খুঁজে থাকেন। এই প্রবণতাটি দেখে সহজেই অনুমান করে নেয়া যায় যে দক্ষ নারী পেশাজীবীদের সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি অর্থনৈতিক ও সমাজব্যবস্থা পরিবর্তনে তাঁদের প্রভাবও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বের ৭,০০০ ফ্রিল্যান্সারদের উপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায় যে, ৮০ শতাংশ লোক প্রযুক্তি জগতে নারীদের ভবিষ্যতের ব্যাপারে বেশ আশাবাদী, যদিও অধিকাংশের মতে এক্ষেত্রে এখনও সমান পারিশ্রমিক, এবং পারিবারিক উৎসাহের ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বিষয়টি খুব ভালোভাবে খাপ খেয়ে যায়। আমরা এখনও সর্বস্তরে নারীদের জন্য নিরাপদ কার্যক্ষেত্র এবং সমানাধিকার তৈরি করতে পারিনি। কিন্তু যখন একজন নারী দক্ষ হয়ে অনলাইন মার্কেটপ্লেসে কাজ করতে যাচ্ছে, তখন তাকে আর নারী পুরুষের বৈষম্যের কোন বিষয়ে থাকতে হচ্ছে না। তখন কে নারী আর কে পুরুষ সেটা মুখ্য থাকে না, মুখ্য থাকে কে বেশি দক্ষ এবং পেশাদার। এছাড়া আরেকটি বিষয়েও দৃষ্টিপাত করা যায়। আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ স্নাতক তৈরি হচ্ছে, যার প্রায় অর্ধেক হচ্ছে নারী। অথচ এর মাঝে একটি বিশাল অংশ ঝরে যাচ্ছে সমাজের বিভিন্ন অংশে বৈষম্য এবং নিরাপত্তার অভাবের কারণে। এই বিপুল পরিমাণ শিক্ষিত নারীদের যদি আইসিটি সেক্টরে যুক্ত করা যায়, তাহলে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও প্রচুর অবদানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।

saidur mamun khan

 সফলতার জন্য যা করতে হবে

অনলাইন মার্কেটপ্লেসে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের নিয়োগের সংখ্যা দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন ব্যবসায়ের জন্য বাংলাদেশী ফ্রিল্যান্সারদের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন ক্লায়েন্টরা। প্রতি মাসে হাজারের বেশি বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সার অনলাইন মার্কেটপ্লেসে যুক্ত হচ্ছেন এবং তারা সাধারণ চাকরির থেকে এই কাজে বেশি আয় করছেন। তবে এই পুরো বিষয়টি কিন্তু বাস্তবে এতোটা সহজ নয়। যারা সফল ফ্রিল্যান্সার, তারা শুরুতে প্রচুর সময় দিয়েছেন স্কিল এবং কমিউনিকেশন ডেভেলপ করার উপর। সফল তারাই হচ্ছে যারা কিছুটা হলেও দক্ষ হয়ে মার্কেটপ্লেসে যোগ দিচ্ছে। অনেকে দেখা যাচ্ছে অতি উৎসাহ হয়ে কোন কাজের দক্ষতা ছাড়াই অনেক কাজে অ্যাপ্লাই করে বসছে, এবং পরবর্তীতে কাজ না পেয়ে হতাশ হয়ে যাচ্ছে। তাই আমাদের সবসময়ই পরামর্শ থাকে যে যথেষ্ট ইংরেজি যোগাযোগ এবং নির্দিষ্ট কোন একটি কাজে দক্ষতা তৈরি না করে আসলে মার্কেটপ্লেসে আসা উচিৎ না। ফ্রিল্যান্স প্রফেশনে আসলে সফল হওয়ার একটাই মূলমন্ত্র – আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেকে তুলে ধরার মত কাজ জানতে হবে, এবং ইংরেজিতে যোগাযোগ করার দক্ষতা তৈরি করতে হবে, আর তার সাথে ধৈর্য ধরে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। তাহলেই সম্ভব এই পেশায় দারুণ একটি ভবিষ্যৎ তৈরি করা।

-

সাইদুর মামুন খান

কান্ট্রি ম্যানেজার (বাংলাদেশ), ইল্যান্স-ওডেস্ক

skhan@elance-odesk.com

বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের জন্য ইল্যান্সের একমাত্র অফিসিয়াল পেজঃ   www.facebook.com/ElanceBangladesh

জেনেসিসব্লগসের ডান দিকে ফরম দেওয়া আছে। সেখানে ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ক যে কোন প্রশ্ন করতে পারেন। সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর নিয়ে প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার বিশেষ একটি পোস্ট থাকবে।