বাঁশঝাড়ে ফুল মানে দুর্ভিক্ষ

Ishtiaque Nur

আমি মূলত একজন IT Expert, তবে একই সাথে Photography এবং গাছপালা লাগানোর প্রতিও আমার সমান আগ্রহ আর সেই আগ্রহ থেকেই এবং গ্রাম বাংলার কৃষক এবং শহরের মানুষকে এই বিষয়ে আগ্রহী করে তোলার জন্যে আমিwww.methopoth.com/ এ নিয়মিত লেখালেখি করি,একি সাথে আমি এটির Admin । আশাকরি আপনাদের সবার অনুপ্রেরনা এবং সমর্থন আমার সাথে থাকবে। ধন্যবাদ সবাইকে
টিউন করেছেন Ishtiaque Nur | March 12, 2015 00:16 | পোস্টটি 777 বার দেখা হয়েছে

images (1)

বাঁশঝাড়ে ফুল  মানে কি সত্যিই দুর্ভিক্ষ !!! বাঁশঝাড়ে ফুল বা গণপুষ্পায়ন (Flowering en masse- ফ্লাওয়ারিং অন মাস) বাঁশ যে একপ্রকার ঘাস তা ভাবতে বিস্ময়কর মনে হলেও সত্যি। এই অতি প্রয়োজনীয় গাছটির শুধু অবয়বে নয় স্বভাবেও আছে কিছু অদ্ভুত আচরণ। নানা প্রকার বাঁশঝাড়ে নানা সময়ে ফুল ধরে; কোনোটিতে ফি-বছর, কোনোটিতে ৩ বছর, কোনোটিতে ৫০ বছর, কোনোটিতে বা একশো-সোয়াশো বছর পরেও। ভারতের নিজোরাম রাজ্য, বার্মার (মায়ানমার) চিন্‌ আর বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে মেলোকানা বাকিফেরা (Melocanna baccifera) নামে একপ্রকার মুলি বাঁশ জন্মে যাতে ৪৮ বছর পর পর ফুল ধরে। এদিকে জাপানী বাঁশ (Phyllostachys bambusoids) ১৩০ বৎসর পর পর্যন্ত ফুলবতী হতে পারে। মজার বিষয় হচ্ছে  এই গাছের বীজ বা রাইজোম নিয়ে যদি একই সময়ে লাগানো হয় আমেরিকা, ইউরোপ বা আমাজনের অরণ্যে তবু একই সময়ে ফুল ফুটবে তাতে। পরিবেশ, আবহাওয়া কোনো কিছুই তাদের এই ৪৮ বছর পর ফুলফোটার নিয়মকে ভাঙতে পারবে না। কেন এমন হয়, এর সঠিক কারণ নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো অনুসন্ধান করে চলেছেন। তবে এই বাঁশ গাছের প্রতিটি উদ্ভিদ-কোষের ভেতরে এর ফুল ফোটার আঙ্কিক নিয়ম-নীতি নির্ধারিত থাকে বলে মনে করা হয়। নিয়মিত বাঁশঝাড়ে ফুল ধরলে কোনো অসুবিধা নেই, কিন্তু বহু বছর পর যদি বাঁশঝাড়ে হঠাৎ একছড়া ফুল ফুটে ওঠে তাহলে প্রমাদ গোণে মিজোরামের দরিদ্র মানুষ। এই ফুল কয়েক বর্গমাইল এলাকা জুড়ে অবিরাম ফুটতে থাকবে ২-৩ বছর ধরে। এমনি এক ঘটনার পর পূর্বপুরুষদের অভিজ্ঞতা থেকে তাদের ভেতর প্রচণ্ড ভীতি ঢুকে পড়লে তারা কঞ্চির খোঁচা খেয়ে রক্তাক্ত শরীর নিয়ে ঘিঞ্চি বাঁশের ঝাড়ে গিয়ে অশুভ ফুলের ছড়া কেটে ফেলে দিয়েছে পাগলের মতো। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি তাতে। আবার সেই একই জায়গা থেকে বেরিয়েছে সর্বনাশা ফুলের ছড়। এই ফুল থেকে ফল হয়, অন্য বাঁশের তুলনায় বেশ বড়সড় ফল, জলপাইয়ের চেয়েও বড়। ফল পড়ে গাছের তলা বিছিয়ে থাকে। আর আশেপাশের  গ্রামের ইঁদুর আসে এই ফল খেতে; মাটি থেকে খায়, গেছো ইঁদুর গাছে চড়েও খায়। এই ফলের পুষ্টিগুণ অনেক, তার ওপর এটা আবার আফ্রোডিসিয়াক। তাই ইঁদুরের সংখ্যা বাড়তেই থাকে, হাজারে হাজারে লক্ষে লক্ষে। বাঁশতলা থেকে এবার ইঁদুরের দল মাঠে নেমে আসে, ফসলের দিকে মনোযোগী হয়। ফসল শেষ করে চলে আসে শস্যের ডোলে। সারারাত জেগে ইঁদুর তাড়িয়ে মাত্র দশ ভাগ শস্য যা তারা উঠিয়েছিল শস্যাধারে তাও শেষ হয়ে যায়। মিজোরা এবার শিকড়বাকড় কচু-ঘেঁচু আর মেটে আলু খায়, সেগুলো শেষ হলে প্রাণে বাঁচার জন্যে ধরে ধরে ইঁদুরই খেতে থাকে চুলোর ওপরে রোস্ট করে।। এ সময় এলাকাবাসীদের মধ্যে নানারকম রোগ ছড়িয়ে দেয় ইঁদুর, টাইফয়েড, টাইফাস, প্লেগ। রোগ আর পুষ্টির অভাবে দুর্বল শরীর নিয়ে তারা আর গাছের গোড়া খুঁড়ে কন্দ জাতীয় খাবার সংগ্রহ করতে পারে না। যথকিঞ্চিৎ সরকারি রিলিফের খাদ্য আর ওষুধ আসার আগেই প্রাণহানি ঘটে অজস্র মানুষের। এরপর লক্ষ লক্ষ ইঁদুরও মরে যেতে বাধ্য হয় খাদ্যের অভাবে। বাঁশঝাড়ও মরে যায়, যে প্রচণ্ড শক্তি ব্যয় করে সে বংশ-ফসল ফলায় তাতে তার আর জীবনীশক্তি থাকে না। তবে বাঁশঝাড়তলায় লক্ষ লক্ষ ভুক্ত ফলের মধ্যে তখনো অলক্ষ্যে লুকিয়ে থাকা অনেক ফল থেকে জন্ম নেয় নতুন বাঁশের চারা। আবার গড়ে ওঠে বাঁশের নতুন জনপদ। এই বাঁশঝাড়ে ফুল বা  গণপুষ্পায়ণ ও সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয় নিয়ে টিভিতে ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক ডানিয়েল জ্যানজেন। গাছ তার বংশরক্ষার জন্যেই এমন কৌশল অবলম্বন করেছে বলে তার বিশ্বাস।বাঁশঝাড়ে ফুল এর ব্যাপারে তিনি আরো উল্লেখ করেন প্রাণীজগতের স্যামন মাছ ও প্যাসেঞ্জার পিজিয়নের কথা। প্রকৃতি বিষয়ক চ্যানেলে আমরা প্রায়ই দেখি, জলের কিনার থেকে অল্প পানিতে থাবা দিয়ে স্যামন মাছ তুলে নিচ্ছে ভল্লুক। যুগ যুগ ধরে ভল্লুকের শিকার হয়ে হয়ে এখন বেবি স্যামনরা  পালিয়ে যায় সমুদ্রে, যেখানে সে বাস করে ৪-৫ বছর, খেয়ে দেয়ে স্বাস্থ্য লাভ করে অসংখ্য স্যামন একযোগে ফিরে আসে নদীতে। তারপর সেখানে তারা ডিম পাড়ে, যে ডিম ফুটে এত অধিক সংখ্যক বাচ্চা হয় যে সারা নদীতে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। এখন যত মাছই পশু পাখি মানুষ খাক না কেন স্যামনের বংশ ধ্বংস করার সাধ্য কারো থাকে না। সব ওক গাছের ফল (একর্ন) যদি মোটামুটি পরিমাণমত ধরতো তবে হরিণ, কাঠবিড়ালি আর কবুতর নিঃশেষে খেয়ে ফেলতো সব ফল, ওকের আর বংশ রক্ষা হত না। তাই ৩ বছর পর পর একর্নের বাম্পার ফলন হয় যা পশুপাখি খেয়ে শেষ করতে পারে না কিছুতেই। ওদিকে অন্তরবর্তীকালীন সময়ে খাবার সংগ্রহে কষ্ট হয় বলে পশু-পাখির সংখ্যাও নিয়ন্ত্রণে থাকে, প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় থাকে। ভারতের মিজোরাম ও মনিপুর রাজ্যে বাঁশের গণপুষ্পায়ন হয়েছে ১৯৫৮-৫৯ সনে। এর ৪৮ বছর পর অর্থাৎ ২০০৬-০৭ সনেও এর প্রভাব দেখা গেছে ভারত, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের বান্দরবাণ, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়িতে। জুম চাষ নষ্ট হবার ফলে এতে উপজাতীয় লোকজন ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরবর্তী পুষ্পায়ন হবে ২০৫৪-৫৫ সনে। প্রকৃতিতে খাদ্য পুষ্টি বাসস্থান নিয়ে উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতে পরস্পরের মধ্যে নিদারুণ প্রতিযোগিতা চলে। হঠাৎ ইঁদুরের উৎপাত বেড়ে যাবার ঘটনা থেকে সাহিত্যক্ষেত্রে রচিত হয়েছে রবার্ট ব্রাউনিং-এর অনন্য কাহিনী “হ্যামিলনের বংশীবাদক”, আলোচিত হয়েছে লন্ডন শহরের গ্রেট প্লেগ, ইঁদুর নিয়ন্ত্রণের জন্যে হেলিকপ্টার দিয়ে বিড়াল নামাতে হয়েছে মালয়েশিয়ার এক দ্বীপে। আমরা প্রকৃতির এক বিপুল অংশ। লুপ্ত প্রাণীর তালিকায় আমরাও রয়েছি বেশ ওপরের দিকেই, ১১ নম্বরে। এই প্রতিযোগিতার মধ্যে সফলভাবে বেঁচে থাকার জন্যে প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে আমাদেরও বেঁচে থাকতে হবে ।লেখাটি আগে  প্রকাশিত হয়েছিলো http://methopoth.com/