বিজয় নামের ছেলেটির ফরেক্স ট্রেডিং করে বিজয়ী হওয়ার গল্প!

অপ্রস্তুত আযহার

মীর আযহার আলি। পেশায় একজন ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট। পাশাপাশি অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও অন্যান্য বিষয়ে ব্লগে লেখালেখি করছেন। সাম্প্রতিক বিশ্বে ঘটে যাওয়া প্রত্যেকটি বিষয়ে তিনি আপডেট থাকতে পছন্দ করেন। তার বিভিন্ন লেখাগুলো পড়বে পারবেন জেনেসিসব্লগ, টেকটিউনস এবং সামহোয়ারইন ব্লগ থেকে।
টিউন করেছেন অপ্রস্তুত আযহার | August 18, 2016 06:12 | পোস্টটি 2,727 বার দেখা হয়েছে

ফরেক্স ট্রেডিংআজ আমার পরিচিত এক ছেলের ফরেক্স ট্রেডিং করে বিজয়ী হওয়ার গল্প শোনাব আপনাদের। ছেলেটির নাম বিজয়। ছেলেটির সাথে এক সময় একটা প্রজেক্টে কাজ করেছিলাম আমি, আমাদের অফিসে ইন্টার্ন করেছে। তার সাথে অনেক দিন পর গত পরশু দেখা হল। ভারি এনার্জেটিক আর জলি মাইন্ডের ছেলে। কথা বলার সময় সারাক্ষন মুখে হাসি লেগে থাকে তার।

কথায় কথায় বললাম, “আমি চাকরির পাশাপাশি ফরেক্স বিষয়ক একটা আন্তর্জাতিক মানের ওয়েবসাইট চালাচ্ছি”। বিজয় তো শুনে অবাক! বলল, “আমি নিজেও তো ফরেক্স ট্রেডিং এর সাথে জড়িত আছি”।

আমি জিজ্ঞেস করলাম- “ট্রেডিং লাইফ যাচ্ছে কেমন?”

আমার প্রশ্নের সাথে সাথে কোন জবাব দিল না বিজয়। তার চোখে-মুখে অদ্ভুত এক ধরনের অনুভূতি। কিছুক্ষন চুপ থাকার পর বিজয় বলল, সে তো অনেক কাহিনী ভাইয়া। সবটা শুনতে গেলে অনেক সময় লাগবে।

আমার শুনতে খুব আগ্রহ হল। বললাম, আমার সময় আছে, অসুবিধা নাই। তুমি শোনাও।

একটা হোটেলে বসে চা- পুরি খাওয়ার ফাকে বিজয়ের মুখে তার ফরেক্স লাইফের কাহিনী শুনলাম সব। শুনে কিছু জিনিস শিখলাম তার কাছ থেকে। এখন ভাবছি গল্পটা আপনাদের সাথে শেয়ার করি। শুনে হয়ত আপনাদের উপকারে আসতে পারে। তবে উপকার হোক বা না হোক, মজা পাওয়ার গ্যারান্টি! তবে এই খানে একটা ব্যাপার বলে রাখি- ছেলেটির আসল নাম কিন্তু “বিজয়” না! ছেলেটির অনুরোধে তার নাম পরিচয় গোপন রাখছি। সম্বোধনের সুবিধার্তে “বিজয়” নামটি ব্যবহার করলাম তাই।

 ***

বিজয় অনেক আগে থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি অনলাইনে টুকটাক কাজ করত। সে অনেক দিন থেকেই ফরেক্সের কথা শুনে আসছে মানুষের মুখে, কিন্তু এই বিষয়ে কোন বিস্তারিত আইডিয়া নেই তার। সে অনেক জায়গায় বিজ্ঞাপন দেখেছে, “মাত্র এক সপ্তাহে ফরেক্স শিখে দৈনিক ১০০ ডলার আয় করুন”, “$১০০ ডিপোজিট করলে মাসে $১০০০ আয়ের নিশ্চয়তা”- এই রকম আরও কত কি! তাই বিজয় অবশেষে সিদ্ধান্ত নিল যে সে ফরেক্স ট্রেডিং করবে। দেখা যাক এখান থেকে কিছু আয় রোজগার করা যায় কি না!

বিজয় ফরেক্স শেখার চেষ্টা করল। সে চালু ছেলে। অনলাইনে আর্টিকেল পড়ে, ইউটিউবে ভিডিও দেখে দেখে বেসিক অনেক কিছুই শিখে ফেলল। কিন্তু তাই দিয়ে কি আর লাইভ ট্রেডিং এ যাওয়া যায়? একা একা কতটুকু সুবিধা করা যায় বলেন? সে ভাবছিল এমন কাউকে যদি পাওয়া যেত যে তাকে এই সব বিষয়ে এক্তু ভাল পরামর্শ দিতে পারবে!

একদিন বিজয় দেখল ফেসবুকে কোন একটা ফরেক্স গ্রুপে “মিশকাত আনোয়ার” নামে এক ব্যক্তি একটা পোষ্ট করেছে। পোষ্টের শিরোনাম ছিল- “ফরেক্স শিখুন, অবিশ্বাস্য আয় করুন”। পোষ্ট টি পড়ে বিজয়ের মনে হল এই মিশকাত নামের লোকটি খুব অভিজ্ঞ ফরেক্স ট্রেডার। সে অন্যদের হেল্প করতে চাচ্ছে। বিজয় তো ভারি খুশী হল। ভাবল এবার তার কাছ থেকে নিশ্চয়ই অতি সহজে ফরেক্স শেখা যাবে।

বিজয় গ্রুপের সেই পোস্ট থেকে মিশকাতের ফোন নাম্বার সংগ্রহ করে নিয়ে ফোন করল। ফোনে মিশকাত বলল, “ফরেক্স ট্রেডিং করে লাভ করা অনেক কঠিন। অনেক সময় লাগে শিখতে। কিন্তু আপনাকে কষ্ট করতে হবে না। আমরা এখানে সবাই অনেক এক্সপেরিয়েন্সড ট্রেডার আছি। আমরা সবাই মিলে আপনাকে সিগন্যাল দিয়ে সাহায্য করব। আমাদের সিগন্যাল অনুযায়ী ট্রেডিং করলে আপনি অল্প সময়েই অনেক বেশি ইনকাম করতে পারবেন”।

শুনে বিজয় তো অনেক খুশি, বলল, “আপনাদের সিগন্যাল পাওয়ার জন্য আমাকে কি করতে হবে?”

মিশকাত জবাব দিল, “আপনাকে আমাদের রেফারেল লিংকে গিয়ে $১০০০ ডিপোজিট করতে হবে”

“কোন ব্রোকারে ডিপোজিট করব?” বিজয়ের প্রশ্ন।

“আপনি কাঁঠাল ব্রোকারে ডিপোজিট করুন, আমরা ঐ ব্রোকারের সাথেই কাজ করছি”।

পাঠক! ভয় পাবেন না! কাঁঠাল ব্রোকার নামে আসলে কোন ব্রোকার নেই। ব্রোকারটি অনেকেরই পরিচিত বিধায় আমি নাম গোপন রেখে “কাঁঠাল ব্রোকার” নামে ডাকছি। ব্রোকারটি খানিকটা কাঁঠালের আঠার মত আচরণ করে। একবার একটা একাউন্ট ওপেন করলে, ওদের কাস্টমার কেয়ার থেকে আপনার কাছে দিনে অন্তত দুই তিন বার ফোন করবে ডিপোজিট করার জন্য! তাই তাদের নাম দিয়েছি “কাঁঠাল ব্রোকার”।

তো, কি আর করা? আয় করতে গেলে তো রিস্ক নিতেই হবে। বিজয় ঐ কাঁঠাল ব্রোকারে গিয়ে ডেমো অ্যাকাউন্ট ওপেন করল। দুই এক সপ্তাহ সে ডেম ট্রেডিং করল কাঁঠাল ব্রোকারে। ততদিনে ভিডিও দেখে দেখে এন্ট্রি, এক্সিট, বাই, সেল, স্টপ লস, টেইক প্রফিট, পেন্ডিং অর্ডার ইত্যাদি বেশ ভালই রপ্ত করে ফেলেছে বিজয়। শুধু অ্যানালাইসিস করতে পারে না বলে বঝেনা মার্কেটে কখন “বাই” আর কখন “সেল” করবে। বিজয়ের তখন একটাই চিন্তা – “এখনই রিয়েল ট্রেড শুরু করে দেয়া দরকার। সারা জীবন কষ্ট করে মানুষ হয়েছে। বড়লোক তাকে হতেই হবে”।

অনেক কষ্টে বাসা থেকে $১০০০ কেনার মত টাকা জোগাড় হল। $১০০০ ডলার মানে দেশি টাকায় কত হয় তা তো আপনারা জানেনই। একজন স্টুডেন্ট এর পক্ষে এত যোগাড় করা মুখের কথা ছিল না। ফ্রিল্যান্সারদের কাছ থেকে $১০০০ স্ক্রিল কিনে সে ডিপোজিট করল কাঁঠাল ব্রোকারে, মিশকাত ভাইয়ের আন্ডারে। কিন্তু বিধিবাম! ডিপোজিট করার পর থেকে মিশকাত ভাইকে ফোন করলে তিনি আর ধরছেন না। ডিপোজিট করা শেষ, এখন ফোন ধরার কি প্রয়োজন, বিজয় ট্রেড করলে তিনি তো কমিশন পাবেনই। ট্রেডিং করার ব্যাপারটা হচ্ছে নেশার মত। এই নেশা সবারই আছে। একবার ডিপোজিট করলে বিজয় ট্রেডিং না করে পারবে না, সেটা মিশকাত ভাই ভালই জানেন। আসল ব্যাপারটা হচ্ছে ঐ ব্যাটা মিশকাত নিজে ফরেক্স করে না, ফরেক্সের “ফ” ও জানে না! সে মানুষ জনকে ধরে ডিপোজিট করায়। মানুষ ট্রেড করে লস খায়, মিশকাত আইবি কমিশন পায়!

***

এর পর আর কি করা? বিজয় ভাবল যে সে নিজেই ট্রেড করবে। আরও দুই একদিন সে ফরেক্সের বাংলা- ইংরেজি আর্টিকেল পড়ে এবং ইন্টারনেট ঘেঁটে থেকে শিখল যে সব সময় অল্প রিস্ক নিয়ে ট্রেড করতে হবে, লোভ করা যাবে না, অ্যানালাইসিস করতে হবে। অ্যানালাইসিস করতে না পারলে ট্রেড করে লাভ ক্রয়া যাবে না! বিজয় তো অবাক! এই জিনিস গুলো তো সে আগে জানত না!

শুরু হয়ে গেল বিজয়ের ট্রেডিং। প্রথম দিন ০.০১ স্ট্যান্ডার্ড লটে ১০ সেন্ট পিপস ভ্যালু দিয়ে একটি ট্রেড ওপেন করল। প্রথম ট্রেডেই ১০০ পিপস প্রফিট। $১০০০ থেকে $১০১০ হয়ে গেল। ২য় ট্রেডে আবার $১২ ডলার প্রফিট। ইন্ডিকেটর দেখে ট্রেড করছে, স্টপ লস, টেক প্রফিট ব্যবহার করছে। এভাবে ১০টা ট্রেড করল। ৩টা লস, ৭ টাতে প্রফিট। ৩ দিনে ব্যালেন্স এখন $১০৯৫।

নতুন চিন্তা আসলো বিজয়ের মাথায়। লাভ তো হচ্ছে। ০.০১-০.০২ লটে সে ট্রেড করছে এখন। লট সাইজ যদি একটু বাড়ানো যেত, লাভটা আরও বেশি আসতো। ইন্টারনেটে- ফেসবুকে সে দেখে যে সবাই প্রতিদিন কয়েকশো ডলার লাভ করে আর সে কিনা মাত্র $৯৫ ডলার লাভ করেছে ৩ দিনে?

বিজয় সিদ্ধান্ত পাল্টাল। এবার থেকে সে ০.০৫ লটে ট্রেড শুরু করে দিল। প্রথম ট্রেডেই $২৫ লস। ২য় ট্রেডে অবশ্য $৫০ লাভ হল। তারপরের ট্রেডে $৩০ ডলার। লাভ বেড়েই চলেছে। বিজয় এবার লট সাইজ ডাবল করে দিল। পার পিপস $১ করে। ১ দিনেই $২৩০ লাভ করে ফেলল। তারপরের ১ সপ্তাহে লাভ লস মিলিয়ে ব্যালেন্স $২৫০০ হয়ে গেছে। এখন বিজয় আরও বেশী রিস্ক নিয়ে ট্রেড করে। মাঝে মাঝে $৫ পিপস ভ্যালু দিয়েও স্ক্যাল্পিং করে। ৩ সপ্তাহের মাথায় বিজয়ের ব্যালেন্স $৩২০০ হল। বিজয় নিজের পারফরমেন্স নিয়ে সন্তুষ্ট। ফরেক্স অনেক সহজ, কে বলেছে এত অ্যানালাইসিস লাগে? বেড়ে গেলে সেল দিলেই হয়, আবার কমে গেলে বাই। পানির মত সহজ কাজ!

এর পর একটা সময় এল! NFP নিউজ এর সময়! ঘটনা হচ্ছে যে বিজয় ফান্ডামেন্টাল অ্যানালাইসিস করে না, বুঝেও না তেমন একটা। লাভ করতে করতে বিজয়ের এখন ওভার কনফিডেন্স হয়ে গেছে! স্টপ লসও এখন আর ব্যবহার করে না সে। সে ভাবে এইসব নিউজ গুলো কোন কাজে আসে না। বরং মার্কেটে যে ভোলাটিলিটি সৃষ্টি হয়, তাতে ভাল স্ক্যাল্পিং করা যায়।

বিজয় ০.৫ লট ($৫ পিপস ভ্যালু) দিয়ে একটি ট্রেড ওপেন করলো EUR/USD তে বাই ট্রেড। হঠাৎ স্পাইকের কারনে মার্কেট ৯০ পিপস পরে গেল। বিজয়ের যেহুতু এসব ব্যাপারে অভিজ্ঞতা নেই, সে ভাবল নিশ্চয়ই মার্কেটে কিছু একটা হয়েছে। ভাবল প্রাইস তো একটু পরে বাড়বেই। সে ০.৫ লটে আরও একটি বাই ট্রেড ওপেন করল। মার্কেট এবার আরও পড়ছে। $৩২০০ থেকে বিজয়ের ইকুইটি এখন $১৫০০ ডলার। কি করবে বুঝতে পারছে না। যেহুতু প্রাইস কমছে, সে ভাবছে এতো তো কমার কথা না, একটু পরে প্রাইস আবার বাড়বে, তাই এখন যদি আরও ২টি ট্রেড ওপেন করা যায়, প্রাইস বাড়লে কম হলেও ব্যালেন্স $৫০০০ হয়ে যাবে। এবার ০.৫ লটে সে ২টি ট্রেড ওপেন করে দিব। প্রাইস একটু বাড়ল। দেখল ব্যালেন্স খুব দ্রুত রিকভার হচ্ছে। ইকুইটি এখন $২০০০ ডলার। সে কিছুটা আশান্বিত হল। হঠাৎ প্রাইস আরও ১০০ পিপস কমে গেল। বিজয়ের ৪টি ট্রেডই মারজিন কলের কারনে বন্ধ হয়ে গেল।

বিজয়ের ব্যালেন্স এখন $০.১০ মাত্র। নিজের কাজের কারনে সে অনুতপ্ত হল খুব। এক্কেবারে মাথায় হাত! কেন যে এত রিস্ক নিতে গেল? $৩২০০ থেকে যদি $১০০ আগে উইথড্র করে রাখতো। ইসস!

***

এখানে একটা বিষয় আমি বুঝলাম যে বিজয়ের ট্রেডিং মেথডে আসলে কোন ধরনের ভুল ছিল না! কিন্তু কিছু কিছু ব্যাপার না বুঝার কারনে সে পুরা ধরা খেয়ে গেল। তবে এবার বিজয় সিদ্ধান্ত নিল যে সে আর একা একা ট্রেড করবে না। এবার অনেক সতর্ক হবে। আর অভিজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে ট্রেড করবে। এবার সে $৫০০ অতি কষ্টে কোন রকমে জোগাড় করল। একদিন রাস্তায় একটা ফরেক্স বিষয়ক বিজ্ঞাপনের পোস্টার দেখে আগ্রহী হল সে।

সেখানে গিয়ে হাবিব নামে এক ফরেক্স ট্রেডারের সাথে পরিচয় হল বিজয়ের।তিনি নাকি অনেক অভিজ্ঞ ফরেক্স ট্রেডার, ৭ বছর থেকে ফরেক্স করেন, মাসে লাখ লাখ ডলার ফরেক্স থেকে লাভ করেন। তিনি বললেন, “আমরা ফরেক্স সিগন্যাল দেই। মাসে ২৫০০ টাকা। ১০০% প্রফিট গ্যারান্টি”।

বিজয় সেই কথা শুনে তো আকাশ থেকে পড়ল! লাখ ডলার মাসে ইনকাম! এটাই তো তার চাই! সে ভাবল হাবিব ভাইয়ের সাথে আগে কেন দেখা হলোনা তার?

হাবিব ভাই তাকে কিছু টেকনিক শিখিয়ে দিল। বলে দিল কখন স্টপ লস ব্যবহার না করতে। শুধু তারা যেভাবে বলে সেভাবে ট্রেড করতে হবে। বিজয় রাজি হল।

সেদিন বাসায় ফিরে বিজয় তার বন্ধু তোফাজ্জলকে বলল, “দোস্ত আজ একজন জটিল ফরেক্স ট্রেডারের সাথে পরিচয় হল। জোশ ট্রেড করে। আমি এখন থেকে তার কাছ থেকে সিগন্যাল নিব। তার কাছে ভর্তি হয়েছি। মাসে ২৫০০টাকা দিতে হবে”।

তোফাজ্জল অল্প স্বল্প ট্রেডিং বুঝে। তবে অল্প বুঝলেও কোনটা সত্যি আর কোনটা ভাওতাবাজি তা বুঝার ক্ষমতা তোফাজ্জলের আছে। সে বলল, “যে মাসে লাখ লাখ ডলার আয় করে, সে কেন ২৫০০ টাকায় সিগন্যাল দেয়? তার কাছে তো ২৫০০ টাকা কোন টাকাই হবার কথা না”।

বিজয় এসব কথায় কান দিল না। সে এবার হাবিব ভাইয়ের কথায় সখিনা ব্রোকারে ৫০০ ডলার ডিপোজিট দিল।

সেদিন রাত ৮ টায় হাবিব ভাই ফোন দিয়ে বলল, “১.৪৬০০ তে একটা বাই দাও। EURUSD এবার ১.৫০০০ যাবে শিওর”।

বিজয় তার কথামত বাই দিল। মার্কেটের কি অবস্থা তা সে নিজেও দেখল না। সে মোটামুটি টেনশন ফ্রি আছে এখন। সে তো এখন সব প্রোফেসনাল ট্রেডারদের সিগন্যাল ফলো করছে! তার প্রফিট এখন আর ঠেকায় কে?

কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠে বিজয় দেখে EUR/USD ১.৪৪৫২ তে। হাবিব ভাইকে ফোন দিল, ভাই কি করব? হাবিব ভাই বলল, “এটা মার্কেটের সাধারন মুভমেন্ট, প্রাইস ১.৫০ তে যাবেই। তুমি বরং ওই প্রাইসে আরও ১টা বাই ট্রেড ওপেন করে রাখো আর আমার সিগন্যালের ওপর আস্থা রাখো। আর যদি ১.৪৩০০ তে যায়, তবে আরেকটা বাই করো”।

২ দিন পর, প্রাইস গেল ১.৪০৯৮ এ নেমে।

হে হে! যা হওয়ার, তাই হল। হাবিব ভাইয়ের সিগন্যালে বিজয়ের ব্যালেন্স আবার জিরো। বিজয় এরপর রাগে- কষ্টে ফরেক্স ট্রেডিং ছেড়ে দিল। আর ট্রেডিং করবে না বলে ঠিক করল।

***

এর মধ্যে টাকা যোগাড় করতে গিয়ে তাকে অনেক দামি জিনিস বিক্রি করতে হয়েছে, দামি মোবাইল, শখের গিটার আরও অনেক কিছু। বাবার একাউন্ট থেকে টাকা নিয়েছিল। বন্ধু বান্ধবদের কাছে ধার দেনা। সে কোন চাকরিও করে না যে সেগুলো শোধ করবে। হতাশ হয়ে দুশ্চিন্তায় তার অবস্থা কাহিল। এই সময়ে রাতে সে অ্যাপলের ফাউন্ডার স্টিভ জবসের সাক্ষাৎকার পড়ছিল। সে জানতে পারল এই লোকটা কত সমস্যা ফেস করে, কত বাধা অতিক্রম করে অবশেষে সফল হয়েছে। এতে করে নতুন উদ্যম ফিরে পেল বিজয়। ফরেক্স তার সব কিছু কেড়ে নিয়েছে, তাই সে ফরেক্স থেকেই সব কিছু ফিরিয়ে আনবে।

এবার বিজয় ফরেক্স বিষয়ে বাইরের ওয়েবসাইট, বড় বড় ট্রেডার আর টিউটরিয়াল ফলো করতে থাকল। ইংরেজিতে ভাল হওয়ার কারনে তার এই সব বিষয় খুব একটা বুঝতে সমস্যা হত না। সে সিদ্ধান্ত নিল যে আর কোন দেশি অভিজ্ঞ ট্রেডার এর কথা শুনতে যাবে না। তার ধারনা হল নিজের দেশের লোকেরা কার ভাল চায় না। কে কিভাবে কার টাকা মেরে খাবে সেই চিন্তা করে। উপকারের চিন্তা মাথায় নেই কারো। এর পর বিজয় অ্যাডমন্ড ব্রসন্যান নামে এক ট্রেডারের সাথে টুইটারে অ্যাড হল। অ্যাডমন্ড ব্রসন্যান এস্তোনিয়ার ট্রেডার। তিনি ডেইলি এফএক্স, ফরেক্স ফ্যাক্টরি এইসব সাইটে নিয়মিত লিখেন। আর নিজের টুইটার একাউন্টে ফ্রি ফ্রি ট্রেডিং সিগন্যাল দেন।

বিজয় এত দিন যে নতুন করে ট্রেডিং শিখছে, এই সময়ে কিন্তু সে কোন ট্রেডিং করে নি। তবে তার ট্রেড দক্ষতা অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। সে এখন ফান্ডামেন্টাল অনেক কিছুই খুব ভাল করে বোঝে। তারপরও একজন অভিজ্ঞ মানুষের সহচর্জে থাকলে ভাল করার সম্ভাবনা বেশি থাকে। সে দেখে যে ব্রসন্যানের টুইটার একাউন্টের সিগন্যাল গুলোতে প্রচুর মানুষ কমেন্ট করে। সবাই তাকে ধন্যবাদ জানায়। ট্রেডে লাভ হয়েছে বলে। তাই দেখে বিজয় নিজেও ট্রেডিং এ আগ্রহী হল। কিন্তু কোন ব্রোকারে যাবে এখন?

***

ব্রসন্যান অনেক বড় একটা ব্রোকারে ট্রেড করে। এই ব্রোকারের নাম বলাই যায়- হাই মার্কেটস ( বর্তমান নাম HYCM)। আমার নিজের সাইটে ব্রোকারটির একটি রিভিউ আছে, পড়ে দেখতে পারেনঃ হাই মার্কেটস ব্রোকার রিভিউ। এটি ফরেক্স মার্কেটের সাথে জড়িত আছে ৩৫ বছর ধরে। বিশ্বের প্রথম সারির ৫টা ব্রোকারের একটা। ভাল বোনাস সিস্টেম আছে, সুন্দর অফার আছে, কাস্টমার সাপোর্ট অনেক স্ট্রং, উইথড্র টাইমও কম লাগে। কিন্তু একটু বড় অ্যামাউন্টের ডিপোজিট করতে হয়। মিনিমাম ১০০ ডলার। এই ধরনের ব্রোকারে ট্রেড করাটা বাংলাদেশের মত গরীব দেশের ট্রেডারদের জন্য একটু ঝামেলাই। তারপরও বিজয় কষ্ট করে ১০০ ডলার জমা করে ডিপোজিট দিল হাই মার্কেটস ব্রোকারে।

তারপর ব্রসন্যানের সিগন্যালে শুরু হল বিজয়ের ট্রেডিং যাত্রা। কিন্তু সরাসরি সিগন্যাল দেখে ট্রেড করে না সে এখন আর। অনেক সাবধান হয়ে গেছে। এখন ট্রেড করার আগে ব্রসন্যানের সিগন্যালের সাথে সে নিজের অ্যানালাইসিস মিলিয়ে দেখে। আশ্চর্যের বিষয় হল বিজয় তার নিজের এনালাইসিসের সাথে ব্রসন্যানের সিগন্যালের অনেক মিল পায়। তারপর ট্রেড নিলে প্রায়ই লাভ থাকে। ব্রসন্যান খুব কম রিস্ক নেয়। তার সিগন্যালে প্রফিট হয় কম। কিন্তু লস প্রায় হয়ই না। আর নিউজের টাইমে ব্রসন্যান দারুন সিগন্যাল দেয়। এক্কেবারে! এক ধাক্কায় ১০০ পিপের বেশি প্রফিট তোলে! এভাবে আস্তে আস্তে ব্রসন্যানের ভক্ত হয়ে গেল আমাদের বিজয়।

এর পর হল কি, ব্রসন্যান আস্তে আস্তে সিগন্যাল দেওয়া কমিয়ে দিল। ব্রসন্যানের ভক্তের অভাব নেই। সবাই তার সিগন্যালে ট্রেড করে। সবাই প্রতিদিন কমেন্টে কমেন্টে প্রশ্ন করে সে কেন সিগন্যাল কম দিচ্ছে। আসল ব্যাপার হল যে- পৃথিবীর সব মানুষ স্বার্থ খোঁজে! কেউ ফ্রি ফ্রি বেশিদিন হেল্প করেনা। ব্রসন্যানের মাথায় চিন্তা ঢুকেছে। সে ফ্রি সিগন্যাল দিয়ে মানুষের লাভ করে দিচ্ছে! তার তো নিজের কোন লাভ হচ্ছে না! তাই সে ঠিক করেছে সিগন্যাল দেওয়ার জন্য একটা সাইট ওপেন করবে। সেখানে মানুষকে টাকার বিনিময়ে সিগন্যাল দেবে।

এইবার আমাদের বিজয়ের তো মাথায় হাত! হায় হায়! ব্রসন্যান সিগন্যাল দিবে টাকার বিনিময়ে! না জানি কত টাকা ফি চায়! আবার কোন ভাঁওতাবাজি শুরু হয় কি না কে জানে? ব্রসন্যান নতুন যে ওয়েবসাইট বানালো তার নাম forexprofita . এই সাইটে গিয়ে বিজয় দেখল ব্রসন্যানের সাথে আরও অনেক অভিজ্ঞ ট্রেডাররা মিলে একসাথে সিগন্যাল এর কাজ করে যাচ্ছে। এই সিগন্যাল নেওয়ার জন্য মাসে ১০০ ডলার এর মত ফি দেওয়া লাগবে! সারা দিনে ১০ থেকে ১৫টা সিগন্যাল দেয়া হয়। তার মধ্যে ১০টার মত বিজয় ফলো করতে পারে। এতে ভাল প্রফিট থাকবে। কিন্তু বিজয়ের মত মানুষের পক্ষে ১০০ ডলার ফি দেয়া কষ্টের হবে।

তারপর আরও ভাল একটা অফার খুজে পেল বিজয়! ব্রসন্যান যেহেতু হাই মার্কেটস ব্রোকারে ট্রেড করে। সে HYCM ব্রোকারে যারা ট্রেড করে তাদের ফ্রি মেম্বার শিপ দিবে ট্রেডিং করার জন্য। বাহ! বিজয়ের তো লাভই লাভ! সে তো এমনিতেই HYCM ব্রোকারে ট্রেড করে! তাহলে তো ভালই হল! বিজয় এবার রেজিস্ট্রেশন করার পর তার তার হাইমারকেটস ব্রোকারের লিঙ্ক দেওয়ার পর, তাকে ফরেক্স প্রফিটা সাইটে মেম্বারশিপ দেওয়া হল। মেম্বাররা সিগন্যাল পাচ্ছে রেগুলার! সাইটে কখন সিগন্যাল দেওয়া হবে তা আগে থেকে বলে দেয়া হচ্ছে! কত্ত সুবিধা!

***

এর পর থেকে বিজয়কে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। ফরেক্স করে তার যা গিয়েছিল তার সবই সে ফিরিয়ে এনেছে। পাশাপাশি ইতিমধ্যে লাখ ডলারের মত বাড়টি আয় হয়েছে তার। বাবার একাউন্টের টাকা ফিরত দিয়েছে। ধার দেনা দিয়েছে। নতুন গিটার, দামি আইফোন কিনেছে। তাকে আর পায় কে। চেস্টা, পরিশ্রম আর লেগে থাকার কারনে সে এখন ফরেক্সে গেইনার। বাংলাদেশি ট্রেডারদের কাছে প্রতারিত হওয়ার কারনে এখন সে দেশি ট্রেডারদের এড়িয়ে চলে! তার চলাফেরা যোগাযোগ এখন ইউকে, ইউরোপের বড় বড় দেশের ট্রেডারদের সাথে। অলরেডি দুইবার দেশের বাইরে থেকে ঘুরে এসেছে! গুলশানে বাড়ি গাড়ি আছে এমন বড়লোকের মেয়ে বিয়ে করেছে! তার মাথায় এখন চিন্তা আছে ইমিগ্রেশন নিয়ে কানাডায় চলে যাওয়ার। ফরেক্স ট্রেডিং সেখানে আরও সহজ হবে তার জন্য। নিজের ট্রেডিং একাডেমি দেবে বলে স্বপ্ন দেখছে!

সব শুনে খুব ভাল লাগল আমার। দারুন এক সফল হওয়ার গল্প শুনলাম। আমি খুব কম ট্রেডার দেখেছি যারা ফরেক্স করে বিজয়ের মত এত দূর যেতে পেরেছে! স্যালুট পাওয়ার যোগ্য সে! আমার সাথে পুরো গল্পটা বলার পর আমি বিজয়কে বলেছিলাম তার গল্পটা আমি লিখে ফেসবুকে শেয়ার করব। অনেকের উপকার হবে। বিশেষ করে ব্রসন্যান আর তার সিগন্যাল সাইট forexprofitaএর খবর তো দেশের ট্রেডাররা জানে না!

বিজয় প্রথমে রাজি হয়নি। পরে সে বলল তার নামটা বদলে দিতে। আমি তাই করলাম- নিজে তো এখন ট্রেডিং কমিয়ে দিয়েছি আমি। দেখি আপনাদের যদি কোন লাভ হয়।

  • Md Ariful Islam

    nice story….